দর্শন – ১ম
নোট প্রস্তুতকারক – এ এইচ এনাম
ক বিভাগ এর উত্তরঃ
1.
সবই ঈশ্বর ঈশ্বরেই সব – উক্তি টি
কার ?
** সবই ঈশ্বর, ঈশ্বরেই সব — এই উক্তিটি স্পিনোজা (Spinoza)-এর
2.
AN Outline Of Philosophy গ্রন্থটি কার লেখা ?
** “An Outline of Philosophy” গ্রন্থটি বার্ট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russell)-এর লেখা।
3.
অস্তিত্ত প্রত্যক্ষ নির্ভর - এই উক্তি টি কার ?
** অস্তিত্ব প্রত্যক্ষনির্ভর” — এই উক্তিটি বৈজ্ঞানিক ভাববাদী দার্শনিক বার্কলি (George Berkeley)-এর।
4.
দুই জন যুক্তিবাদী দার্শনিকের নাম
লিখ ?
5.
দুই জন প্রয়োগ বাদী দার্শনিকের নাম
লিখ ?
** দুইজন প্রয়োগবাদী (Pragmatist) দার্শনিক
হলেন —চার্লস এস.
পিয়ার্স (Charles S. Peirce) উইলিয়াম জেমস (William James)
6.
দর্শন শব্দের বুদথপত্তি কোথায় ?
** “দর্শন” শব্দের
উৎপত্তি সংস্কৃত ভাষা থেকে।
7.
সবজ্ঞাবাদের প্রবক্তা কে ?
** সবজ্ঞাবাদ
(Omniscientism)-এর প্রবক্তা হলেন প্লেটো
(Plato)
8.
Ontology
এর বাংলা কি ?
** Ontology এর বাংলা
হলো — অস্তিত্বতত্ত্ব ।
9.
একজন দইত্যবাদি দার্শনিকের নাম লেখ ?
** একজন দ্বৈতবাদী (Dualist) দার্শনিক
হলেন — রেনে দেকার্ত (René Descartes)।
10.
A Treatise of Human Nature – গ্রন্থটির
লেখক কে
?
** A Treatise of Human Nature” গ্রন্থের
লেখক হলেন ডেভিড হিউম (David Hume)
11.
ডেকাতের মতো ধারনা কতো প্রকার ?
** ডেকার্তের মতো ধারণা (Descartes’
Ideas) প্রধানত
৩ প্রকার
12.
সত্যতা সম্পর্কিত মতবাদগুলো কি কি ?
** সত্যতা
সম্পর্কিত প্রধান মতবাদগুলো (Theories of Truth) হলো
·
প্রতিফলনবাদী সত্যবাদ
·
সমন্বয়বাদী সত্যবাদ
·
প্রয়োগবাদী সত্যবাদ
·
স্বজ্ঞাবাদী/অন্তর্নিহিত
সত্যবাদ
13.
নিরবিচারবাদ কি ?
** সিদ্ধান্ত
বা ঘটনার সবকিছু পূর্বনির্ধারিত, এবং কোনো কিছুই এলোমেলো নয়।
14.
Sophia
কি ?
** Sophia হলো গ্রিক শব্দ, যার অর্থ জ্ঞাণ বা প্রজ্ঞা (Wisdom)।
15.
Metaphysics
অর্থ কি ?
** Metaphysics এর অর্থ
হলো — পরমতত্ত্ব বা অতিপ্রকৃতিতত্ত্ব
16.
একজন সর্বস্ববাদী দার্শনিকের নাম
লিখ ?
** একজন সর্বস্ববাদী (Monist / Pantheist) দার্শনিক
হলেন বারুখ
স্পিনোজা (Baruch Spinoza)
17.
বুদ্ধিতে এমন কিছু নেই যা ইন্দ্রিও তে ছিল না – উক্তি টি কার ?
** “বুদ্ধিতে এমন কিছু নেই যা ইন্দ্রিয়েই ছিল না” — এই উক্তিটি ডেভিড হিউম (David Hume)-এর।
18.
ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া বাদের প্রবক্তা কে ?
** ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া (Action-Reaction) বাদের প্রবক্তা হলেন — আইজ্যাক নিউটন (Isaac Newton)
19.
লকের মতে – জন্মের সময় আমাদের মন কিসের মতো থাকে ?
** লকের মতে, জন্মের
সময় আমাদের মন
শূন্য কাগজ (Tabula Rasa)-এর মতো
থাকে।
20.
সৃজন মুলক বিবর্তনের প্রবক্তা কে ?
** সৃজনমূলক
বিবর্তনের (Creative Evolution) প্রবক্তা হলেন — আঁরি বার্গসন (Henri Bergson)।
21.
সমান্তরালবাদের প্রবক্তা কে ?
** সমান্তরালবাদের (Parallelism) প্রবক্তা হলেন — বারুখ স্পিনোজা (Baruch Spinoza)।
22.
Critique of Pure Reason গ্রন্থটি কার লেখা ?
** Critique of Pure Reason” গ্রন্থের লেখক হলেন ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant)
23.
জেও বস্তুর প্রকিতি সংক্রান্ত মতবাদ দুটি কি ?
** জেও (Realism) বা বস্তুর
প্রকৃতি সংক্রান্ত প্রধান দুটি মতবাদ হলো:
·
প্রকৃতিবাদী বাস্তববাদের মতবাদ
·
বৈজ্ঞানিক/সমালোচনামূলক বাস্তববাদের মতবাদ
24.
আত্মার অমরত্ব সম্পর্কিত দুইতি মতবাদের নাম লিখ ?
** আত্মার
অমরত্ব সম্পর্কিত দুইটি প্রধান মতবাদ হলো:
·
সাংখ্যবাদ
·
বৈদিক/ঋষি
দার্শনিক মতবাদ
খ বিভাগ প্রশ্ন উত্তরঃ
1.
দর্শন কিভাবে ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত ?
** দর্শন ও ধর্মের সম্পর্ক:
দর্শন মানুষের জ্ঞান, নীতি ও বাস্তবতা বোঝার প্রচেষ্টা,
আর ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা
ও ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক শেখায়।
দর্শন ধর্মের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান
করে।ধর্মে যে বিশ্বাস বা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা দর্শনের মাধ্যমে যুক্তি ও
বিশ্লেষণের আলোকে বোঝা যায়।যেমন:
ঈশ্বরের অস্তিত্ব, আত্মার অমরত্ব, জীবন ও মৃত্যুর অর্থ ইত্যাদি।
দর্শন ধর্মকে সমালোচনামূলক ও
যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে সাহায্য করে।একইভাবে, ধর্ম দর্শনকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক
থেকে দিকনির্দেশনা দেয়।
2.
মুখ্য ও গৌণ গুনের মাঝে পার্থক্য কি ?
** মুখ্য গুণ
ও গৌণ গুণের পার্থক্য:
|
বিষয় |
মুখ্য গুণ (Primary Quality) |
গৌণ গুণ (Secondary Quality) |
|
উৎস |
বস্তুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য |
বস্তুর সাথে ইন্দ্রিয়ের সম্পর্ক |
|
উদাহরণ |
আকার,
পরিমাপ, ভর |
রঙ,
স্বাদ, গন্ধ, শব্দ |
|
বৈশিষ্ট্য |
স্বাধীনভাবে বিদ্যমান |
ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল |
|
প্রকৃতি |
বাস্তব ও পরিবর্তনহীন |
আপেক্ষিক ও পরিবর্তনশীল |
মুখ্য গুণ হলো বস্তুর অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য, আর গৌণ গুণ হলো বস্তুর ইন্দ্রিয়ানুভূতির
উপর নির্ভরশীল বৈশিষ্ট্য।
3.
আমি চিন্তা করি অতেএব আমি আছি – উক্তিটি কার ?
** আমি চিন্তা করি, অতএব আমি
আছি” (Cogito, ergo
sum) — এই উক্তিটি রেনে দেকার্ত (René Descartes)-এর।
এটি যুক্তিবাদের (Rationalism) প্রধান
নীতি।দেকার্ত বলেছিলেন, আমার চিন্তা করার ক্ষমতা আমার অস্তিত্বের প্রমাণ। অর্থাৎ, সন্দেহ বা
ভাবনার মধ্যেই “আমি আছি” নির্ধারিত
হয়।
4.
দেশ কাল কাকে বলে ?
** দেশ-কালের সংজ্ঞা:
কোনো বস্তু বা ঘটনার অবস্থান বা
স্থানকে দেশ বলা হয়।উদাহরণ: বাড়ি, মাঠ, নদীর
তীর।
কোনো
ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ধাপ বা সময়কে কাল বলা হয়।উদাহরণ: সকাল, বিকেল,
বছর, যুগ।
দেশ হলো বস্তুর স্থান,কাল হলো ঘটনার সময় বা সময়কাল।
5.
ভাববাদ আলোচনা করো ?
** ভাববাদ (Idealism) আলোচনা:
ভাববাদ
হলো দর্শনের একটি শাখা,
যা বলে যে
বাস্তবতা মূলত চেতনা বা মনের মধ্যেই
বিদ্যমান।অর্থাৎ, জগতের সবকিছুই চিন্তা বা ধারণার ওপর নির্ভরশীল।
প্লেটো
(Plato),
বার্কলি (Berkeley)
— তাদের মতে মন বা চেতনা ছাড়া বাস্তবতা নেই।
বস্তু
বা জগতের অস্তিত্ব
আমাদের ধারণা ও চেতনার সঙ্গে যুক্ত।বাহ্যিক
জগতের ধারণা শুধুমাত্র ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে
বোধ করা যায়
ভাববাদ বাস্তবতার চেতনা কেন্দ্রিক ব্যাখ্যা দেয় এবং অভিজ্ঞতাবাদ (Empiricism) এর সঙ্গে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রস্তাব
করে।
6.
সংশয়বাদ আলোচনা করো ?
**
সংশয়বাদ
(Skepticism) আলোচনা:
সংশয়বাদ হলো দর্শনের একটি শাখা যা বলে যে মানুষ সম্পূর্ণ নিশ্চিত জ্ঞান
অর্জন করতে পারে না।এটি সন্দেহ ও প্রশ্ন করার শক্তিকে
গুরুত্ব দেয়।
কোনো সত্যকে অচল বা অনিশ্চিত বলে ধরে।যুক্তি ও অভিজ্ঞতার সীমা স্বীকার
করে।
পিরন (Pyrrho),
সেকেন্দার (Sextus Empiricus) — তারা মনে করতেন জ্ঞান সবসময় আপেক্ষিক এবং
সন্দেহযোগ্য।
সংশয়বাদ মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তিকে সতর্ক রাখে। এটি দর্শনের সমালোচনামূলক দিককে
উজ্জ্বল করে।
7.
সৃষ্টিবাদ ও বিবর্তনের মাঝে পার্থক্য করো
?
** সৃষ্টিবাদ (Creationism) ও বিবর্তনবাদ
(Evolution)
এর পার্থক্য:
|
বিষয় |
সৃষ্টিবাদ (Creationism) |
বিবর্তনবাদ (Evolution) |
|
মূল ধারণা |
পৃথিবী ও জীবজগত ঈশ্বর বা অতিপ্রাকৃত শক্তি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে |
জীবজগত ধীরে ধীরে পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে |
|
উৎস |
ধর্মীয় বিশ্বাস |
বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা |
|
সময়কাল |
সৃষ্টির মুহূর্তে সব কিছু সম্পূর্ণ |
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ক্রমাগত পরিবর্তন |
|
উদাহরণ |
মানুষ, প্রাণী, পৃথিবী ইত্যাদি ঈশ্বরের সৃষ্টি |
চার্লস ডারউইনের “Natural
Selection” অনুযায়ী বিবর্তন |
সৃষ্টিবাদ: সবকিছু ঈশ্বরের ইচ্ছায়। বিবর্তনবাদ: সবকিছু প্রাকৃতিক
প্রক্রিয়ায় ক্রমশ বিকশিত।
8.
জড়বাদ কি ?
ইচ্ছার স্বাধীনতা বলতে কি বুঝ ?
** জড়বাদ (Determinism) কী?
জড়বাদ হলো সেই মতবাদ যা বলে যে সকল ঘটনা, সিদ্ধান্ত ও কর্ম পূর্বনির্ধারিত, এবং কোনো
কিছুই এলোমেলোভাবে ঘটে না। অর্থাৎ, প্রতিটি ঘটনার কারণ-ফল সম্পর্ক
আছে।
ইচ্ছার
স্বাধীনতা (Free Will) বলতে কী বোঝায়?
ইচ্ছার স্বাধীনতা হলো মানুষ নিজের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে
— কোনো বাইরের শক্তি বা কারণ দ্বারা
সম্পূর্ণ নির্ধারিত নয়।
সহজভাবে: মানুষ নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করতে সক্ষম।
সব কিছু
পূর্বনির্ধারিত। ইচ্ছার
স্বাধীনতা: মানুষ নিজের কর্ম-পরিণয় নিজের ইচ্ছায় ঠিক করতে পারে।
9.
মুল্য আত্মা গত না বস্তু গত ? তোমার উত্তরের সাপেক্ষে যুক্তি দাও ?
**
মূল্য: আত্মা-গত
10.
জন লক কিভাবে – দেকাটের ধারনা খণ্ডন করেন ?
** জন লক
দেকার্তের ধারণা খণ্ডন:
দেকার্ত দাবি করেছিলেন কিছু ধারণা জন্মগত — যেমন ঈশ্বর, সংখ্যা,
সত্তা। লক বললেন, মানুষ জন্মের সময় মন
সম্পূর্ণ শূন্য (Tabula Rasa)। মানুষের সব জ্ঞান আসে
ইন্দ্রিয় ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। অর্থাৎ, কোনো ধারণা
জন্মগত নয়; মানুষ শেখে ও উপলব্ধি করে পরিবেশ থেকে। ফলে, লক দেকার্তের
জন্মগত ধারণার তত্ত্বকে যুক্তিসঙ্গতভাবে খণ্ডন করেন।
11.
সজ্ঞাবাদ কি ?
**
সজ্ঞাবাদ (Rationalism):
জ্ঞান ও সত্যের মূল উৎস হলো বুদ্ধি বা যুক্তি।ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র প্রাথমিক তথ্য দেয়।মানুষ যুক্তি
ব্যবহার করে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। প্রধান প্রবক্তা: দেকার্ত, স্পিনোজা, লেইবনিজ।
12.
ইচ্ছার স্বাধীনতা বিষয়ক মতবাদ হিসেবে আত্মনিয়িন্ত্রনবাদ ব্যখ্যা করো
?
** আত্মনিয়ন্ত্রণবাদ হলো ইচ্ছার
স্বাধীনতা সম্পর্কিত মতবাদ। এটি বলে যে মানুষ নিজের ইচ্ছা, চিন্তা ও
কর্মের জন্য নিজেই দায়ী এবং নিজের জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম। মানুষ সম্পূর্ণভাবে
বাইরের কারণ বা জড়বাদের ওপর নির্ভরশীল নয়। তার সিদ্ধান্ত ও কাজ ঘটে নিজের বুদ্ধি
ও নৈতিকতার ভিত্তিতে। এই মতবাদ ইচ্ছার স্বাধীনতা এবং নৈতিক দায়িত্বকে গুরুত্ব
দেয়।
13.
সত্তা সম্পর্কিত মতবাদ হিসেবে বুহুত আলোচনা করো ?
**
বহুতবাদ হলো সেই মতবাদ যা বলে যে বাস্তবতা একক নয়, বরং একাধিক স্বতন্ত্র সত্তার সমষ্টি।
বহুতবাদের মতে, জগৎ একক সত্তার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি
বিভিন্ন বাস্তব উপাদান ও প্রকারের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। প্রধান প্রবক্তারা
মনে করতেন যে সত্য বা বাস্তবতা একাধিক মূল উপাদান দ্বারা গঠিত।
বহুতবাদ এককবাদ এবং দ্বৈতবাদের বিকল্প হিসেবে আসে, যা বিভিন্ন উপাদানের স্বাধীন
অস্তিত্বকে গুরুত্ব দেয়। সংক্ষেপে, বাস্তবতা একক নয়,
বরং একাধিক স্বাধীন সত্তার সমষ্টি, যা
জগতকে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।
14.
যান্ত্রিক ও উদ্দেশ্য মুলক বিবর্তনের পার্থক্য নির্ণয় করো
?
** যান্ত্রিক বিবর্তন
এবং উদ্দেশ্যমূলক বিবর্তনের পার্থক্য হলো:
যান্ত্রিক বিবর্তনে জীবজগতের পরিবর্তন ঘটে প্রাকৃতিক
নিয়ম ও কারণ-ফলের ভিত্তিতে,
যেমন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। এখানে কোনো অভিপ্রায় বা
লক্ষ্য নেই; পরিবর্তন স্বতঃসিদ্ধ এবং এলোমেলো
প্রক্রিয়ায় ঘটে।
উদ্দেশ্যমূলক বিবর্তনে পরিবর্তন ঘটে নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা
উদ্দেশ্যের দিকে ধাবিত হয়ে,
যেমন কোনো জটিল জীববৈশিষ্ট্য বিকশিত হয় একটি নির্দিষ্ট ফলাফল
অর্জনের জন্য। এখানে পরিবর্তনকে সৃজনশীল বা চেতনামূলক প্রক্রিয়া ধরা হয়।
সংক্ষেপে, যান্ত্রিক বিবর্তন প্রাকৃতিক ও এলোমেলো, উদ্দেশ্যমূলক বিবর্তন লক্ষ্যমুখী ও সৃজনশীল।
গ বিভাগ
1.
দর্শন কি ?
দর্শনের বিসয়বস্তু আলোচনা করো ?
**
দর্শন
শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো জ্ঞান বা সত্যের অনুসন্ধান। সংস্কৃত শব্দ
"দর্শন" এসেছে "দৃশ" ধাতু থেকে, যার অর্থ দেখা বা উপলব্ধি করা।
অর্থাৎ দর্শন হলো সেই জ্ঞান যা জিনিসের অন্তর্নিহিত প্রকৃতি বা সত্যকে দেখতে ও
বুঝতে সাহায্য করে। পাশ্চাত্যে দর্শনের সমার্থক শব্দ "Philosophy" এসেছে
গ্রিক শব্দ "Philo" ও "Sophia" থেকে,
যেখানে "Philo" মানে ভালোবাসা
এবং "Sophia" মানে জ্ঞান। সুতরাং দর্শন
অর্থ জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা বা জ্ঞানের অন্বেষণ।
দর্শনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবন, জগৎ ও ঈশ্বর সম্পর্কিত মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা।
মানুষ কেন জন্মেছে, জগতের উৎপত্তি কীভাবে হলো, সত্য কী, জ্ঞান কী, এবং
নৈতিকতার উৎস কোথায় — এসব প্রশ্নের
যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা প্রদানই দর্শনের কাজ।
দর্শনের বিষয়বস্তুকে সাধারণভাবে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্স, যা বাস্তবতা ও সত্তার প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে। দ্বিতীয়ত, জ্ঞানতত্ত্ব বা এপিস্টেমোলজি, যা জ্ঞানের
প্রকৃতি, উৎস ও সীমা নিয়ে গবেষণা করে। তৃতীয়ত, নীতিতত্ত্ব বা এথিক্স, যা ভালো-মন্দ, কর্তব্য ও নৈতিক আচরণের মূল্যায়ন করে।
এ ছাড়া দর্শনের মধ্যে যুক্তিতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব ও সমাজদর্শনের মতো শাখাও রয়েছে।
যুক্তিতত্ত্ব চিন্তা ও তর্কের সঠিক নিয়ম শেখায়, নন্দনতত্ত্ব
সৌন্দর্যের বিশ্লেষণ করে, এবং সমাজদর্শন সমাজ ও
মানবসম্পর্কের ভিত্তি ব্যাখ্যা করে।
সবশেষে বলা যায়, দর্শন এমন একটি জ্ঞানের শাখা যা মানুষকে শুধু জগৎকে বোঝাতেই সাহায্য
করে না, বরং নিজের অস্তিত্ব, মূল্যবোধ
ও জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও গভীর উপলব্ধি দেয়। তাই দর্শনকে বলা হয় সকল জ্ঞানের
ভিত্তি এবং মানবচিন্তার মূল আলো।
2.
জ্ঞানের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদ হিসেবে বুদ্ধিবাদ ব্যখ্যা ও মুল্যায়ন আলোচনা করো ?
* * জ্ঞানের
উৎপত্তি বিষয়ক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ হলো বুদ্ধিবাদ। এই মতবাদে বলা হয়
যে জ্ঞানের উৎস হলো মানুষের বুদ্ধি বা যুক্তি। অর্থাৎ মানুষ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে নয়,
বরং চিন্তা, বিশ্লেষণ ও যুক্তির দ্বারা
সত্য ও জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এই মতবাদকে ইংরেজিতে বলা হয় Rationalism।
বুদ্ধিবাদ মতে, মানুষের মনে কিছু ধারণা জন্মগতভাবে বিদ্যমান থাকে। এসব ধারণা অভিজ্ঞতা
থেকে নয়, বরং বুদ্ধির স্বাভাবিক গঠন থেকেই উদ্ভূত। যেমন – ঈশ্বর, সত্তা, সংখ্যা বা সত্যের ধারণা। মানুষ এই ধারণাগুলিকে ব্যবহার করে বাস্তবতাকে
অনুধাবন করে এবং নতুন জ্ঞান অর্জন করে। বুদ্ধিবাদীরা বিশ্বাস করেন, ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা কখনোই স্থায়ী ও সার্বজনীন জ্ঞান দিতে পারে না,
কারণ ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা পরিবর্তনশীল ও ভ্রান্ত হতে পারে; কিন্তু বুদ্ধি অবিনশ্বর ও সার্বজনীন সত্যকে ধরতে সক্ষম।
বুদ্ধিবাদের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন রেনে দেকার্ত, স্পিনোজা এবং লেইবনিজ। দেকার্ত বলেন,
“আমি চিন্তা করি, অতএব আমি আছি।”
অর্থাৎ চিন্তা বা বুদ্ধিই অস্তিত্বের প্রমাণ। স্পিনোজা মনে করতেন,
যুক্তি ও ভাবনার মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বর ও প্রকৃতির একত্ব উপলব্ধি
করতে পারে। লেইবনিজের মতে, জগৎ অসংখ্য স্বতন্ত্র ‘মনাদ’ বা বুদ্ধিগত সত্তা দ্বারা গঠিত, এবং এই সত্তাগুলির কার্যকলাপ বুদ্ধির নিয়মে পরিচালিত।
বুদ্ধিবাদের মূল্যায়নে বলা যায়, এটি মানুষের চিন্তা ও যুক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।
বিজ্ঞান, গণিত ও যুক্তিবিজ্ঞানের বিকাশে এই মতবাদের
ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখিয়েছে যে মানুষ চিন্তার শক্তির দ্বারা জগৎকে বুঝতে
পারে এবং জ্ঞানের সঠিক পথ নির্ধারণ করতে পারে।
তবে বুদ্ধিবাদের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার গুরুত্বকে
অবহেলা করে। বাস্তব জীবনে অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো জ্ঞান সম্পূর্ণ হয় না। তাই শুধু
বুদ্ধির ওপর নির্ভর করলে জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পরবর্তীকালে অভিজ্ঞতাবাদীরা এই
সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে বলেন যে,
সমস্ত জ্ঞান ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই শুরু হয়।
সর্বশেষে বলা যায়, বুদ্ধিবাদ মানুষের চিন্তা, যুক্তি ও বিশ্লেষণ
ক্ষমতার প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশ করে। এটি জ্ঞানের উৎস হিসেবে বুদ্ধিকে সর্বাধিক
গুরুত্ব দেয়, যদিও সম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জনের জন্য ইন্দ্রিয়
ও অভিজ্ঞতার সহযোগিতাও প্রয়োজন।
3.
বিবর্তন কি ? সৃজনমূলক বিবর্তনের আলোচনা করো ?
** বিবর্তন হলো এক প্রকার
পরিবর্তনের প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জীবজগৎ, চিন্তা, সমাজ ও জ্ঞান ধীরে ধীরে সহজ অবস্থা
থেকে জটিল অবস্থায় উন্নতি লাভ করে। অর্থাৎ, বিবর্তন এমন
একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যেখানে পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে ক্রমান্বয়ে নতুন ও
উন্নত রূপের উদ্ভব ঘটে। জীববিজ্ঞানে এটি প্রজাতির পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দেয়,
আবার দর্শনে এটি জগত ও জীবনের বিকাশের একটি দার্শনিক তত্ত্ব
হিসেবে বিবেচিত।
সৃজনমূলক বিবর্তন হলো এমন একটি দর্শনীয় মতবাদ যা বলে যে, জগৎ বা জীবজগতে পরিবর্তন ও বিকাশ
শুধুমাত্র যান্ত্রিক বা প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং একটি
সৃজনশীল শক্তি বা চেতনার প্রভাবে ঘটে। এই মতবাদের প্রবক্তা ছিলেন ফরাসি দার্শনিক
অঁরি বার্গসন (Henri Bergson)। তাঁর মতে, জীবনের বিকাশে একটি অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি বা “Élan Vital” কাজ করে, যা
সৃষ্টিশীলভাবে জীবের রূপান্তর ও উন্নয়ন ঘটায়।
বার্গসনের মতে, প্রকৃতি কেবল অন্ধ যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত নয়। জীবজগৎ
ক্রমাগত নতুন রূপ ও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করে চলেছে। এই সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া কেবল
প্রাকৃতিক নির্বাচন বা পরিবেশের প্রভাবের ফল নয়, বরং
জীবনের ভেতরের একটি সৃজনশক্তির প্রকাশ।
সৃজনমূলক বিবর্তনের মূল ধারণা হলো, বিবর্তন একটি গতি ও সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া। এটি কেবল বস্তুর রূপান্তর নয়, বরং জীবনের এক অবিরাম সৃষ্টিযাত্রা।
জীব তার স্বভাবজাত শক্তির মাধ্যমে নিজেকে পরিবর্তিত করে, নতুন
রূপে প্রকাশিত হয় এবং উন্নতির পথে অগ্রসর হয়।
এই মতবাদের মূল্যায়নে বলা যায়, বার্গসনের চিন্তা জগৎ ও জীবনের বিকাশকে এক নতুন
দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছে। এটি বিবর্তনে চেতনা, প্রাণশক্তি
ও সৃজনশীলতার গুরুত্বকে তুলে ধরেছে। তবে এর সীমাবদ্ধতা হলো, “প্রাণশক্তি” ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা
যায় না। তাই আধুনিক বিজ্ঞান এটিকে তত্ত্বগতভাবে গ্রহণ করে না।
সবশেষে বলা যায়, সৃজনমূলক বিবর্তন দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব, যা জীবনের বিকাশকে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নয়, বরং
এক চেতনা-নির্ভর সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এটি মানবজীবন ও
প্রকৃতির পরিবর্তনের ভেতরে এক গভীর অর্থ ও উদ্দেশ্য প্রকাশ করে।
4.
দেশ কাল বিষয়গত না বিষয়গীও ? আলোচনা করো
?
** দেশ ও কাল দর্শনের অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারণা। দেশ বলতে স্থান বা পরিসর বোঝায় যেখানে কোনো বস্তু
অবস্থান করে, আর কাল বলতে সময় বা ঘটনার ধারাবাহিক
প্রবাহকে বোঝায়। দেশ ও কালকে কেন্দ্র করে দার্শনিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক
চলে আসছে—এরা কি বিষয়গত (অবজেকটিভ), অর্থাৎ
মানুষের চেতনার বাইরে বাস্তবভাবে বিদ্যমান, নাকি বিষয়গীও
(সাবজেকটিভ), অর্থাৎ মানুষের চেতনার নির্ভরশীল?
যারা দেশ ও কালকে বিষয়গত বলে মনে করেন, তারা বলেন—এগুলো মানুষের মনের সৃষ্টি নয়, বরং বাস্তবে স্বাধীনভাবে বিদ্যমান। বস্তু, ঘটনা ও পরিবর্তন যেভাবে ঘটে, সেগুলো দেশ ও
কালের নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সংঘটিত হয়। যেমন, একটি গাছ
নির্দিষ্ট স্থানে (দেশে) ও নির্দিষ্ট সময়ে (কালে) জন্মে ও বৃদ্ধি পায়। তাই দেশ ও
কাল মানুষের চিন্তার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এগুলো
বস্তুজগতের অপরিহার্য বাস্তব অবস্থা।
অন্যদিকে, বিষয়গীও মতবাদ অনুযায়ী দেশ ও কাল স্বাধীন সত্তা নয়, বরং মানুষের চেতনার এক ধরনের রূপ। ইমানুয়েল কান্ট এই মতের প্রবক্তা
ছিলেন। তাঁর মতে, দেশ ও কাল বাস্তব জগতে বিদ্যমান নয়;
বরং এগুলো আমাদের উপলব্ধির কাঠামো। আমরা যেভাবে বস্তুকে দেখি বা
অনুভব করি, সেই দেখার প্রক্রিয়াতেই দেশ ও কালের ধারণা
যুক্ত থাকে। অর্থাৎ, দেশ ও কাল আমাদের মানসিক গঠন থেকে উদ্ভূত
ধারণা, বাইরের জগতের স্বাধীন বাস্তব নয়।
এই দুটি মতের মধ্যে তুলনামূলকভাবে দেখা যায় যে, বিষয়গত মত দেশ ও কালের বাস্তব
অস্তিত্বকে স্বীকার করে, আর বিষয়গীও মত মানুষকে কেন্দ্র
করে এগুলোর অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করে।
সংক্ষেপে বলা যায়, দেশ ও কালকে একদিকে বাস্তব জগতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা যায়,
আবার অন্যদিকে মানুষের জ্ঞান ও উপলব্ধির কাঠামো হিসেবেও বোঝা
যায়। তাই দর্শনচিন্তায় দেশ ও কাল উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্যাখ্যা করা যায় — তারা আংশিকভাবে বিষয়গত, আবার
আংশিকভাবে বিষয়গীও।
5.
দেহ মনের সম্পর্ক বিষয়ক মতবাদ হিসেবে সমান্তরাল বাদ ব্যাখ্যা করো
?
** দেহ ও মনের সম্পর্ক বিষয়টি
দর্শনের একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। মানুষ একই সঙ্গে দেহ ও মন – এই দুই উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। দেহ হলো পদার্থমূলক,
আর মন হলো চিন্তা, অনুভূতি ও চেতনার
কেন্দ্র। দেহ ও মন কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা
ব্যাখ্যা করতে বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদ দেখা যায়। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মত
হলো সমান্তরালবাদ (Parallelism)।
সমান্তরালবাদ মতে, দেহ ও মন একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়; বরং তারা সমান্তরালভাবে বা পাশাপাশি কাজ করে। অর্থাৎ,
মানসিক ঘটনা এবং শারীরিক ঘটনার মধ্যে কোনো কারণ-ফল সম্পর্ক নেই,
কিন্তু তারা একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলে। এই মতবাদ প্রথম
স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন দার্শনিক বারুখ স্পিনোজা (Baruch
Spinoza)।
স্পিনোজার মতে, দেহ ও মন একই বাস্তবতার দুইটি ভিন্ন রূপ বা দিক। তিনি বলেন, ঈশ্বর বা প্রকৃতি একক সত্তা, যার দুটি গুণ হলো
“প্রসার” (Extension) ও “চিন্তা” (Thought)। দেহ হলো
প্রসারের প্রকাশ, আর মন হলো চিন্তার প্রকাশ। এই দুই দিক একে অপরের সঙ্গে কারণগতভাবে
যুক্ত নয়, কিন্তু তারা একই মূল সত্তার ভিন্ন প্রকাশ হওয়ায়
সব সময় সমান্তরালভাবে কাজ করে। যেমন, যখন আমরা একটি ফুল
দেখি, তখন আমাদের চোখে দেহগত প্রক্রিয়া ঘটে, আর একই সঙ্গে মনে তার ধারণা সৃষ্টি হয় — কিন্তু এই দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ কারণিক
সম্পর্ক নেই; তারা কেবল সমান্তরালভাবে ঘটে।
সমান্তরালবাদের গুরুত্ব হলো, এটি দেহ-মন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ
ব্যাখ্যা দেয়। এতে দেহ ও মনকে পৃথক করে দেখা হয় না, আবার
তাদের মধ্যে সংঘর্ষও সৃষ্টি হয় না। তবে এর সীমাবদ্ধতা হলো, এই মতবাদ ব্যাখ্যা করতে পারে না যে কীভাবে দেহ ও মন একই সঙ্গে
সমন্বিতভাবে কাজ করে, যদিও তাদের মধ্যে কারণিক সংযোগ নেই।
সবশেষে বলা যায়, সমান্তরালবাদ এমন একটি মতবাদ যা দেহ ও মনকে একে অপরের সঙ্গে
সমান্তরালভাবে চলমান বলে ব্যাখ্যা করে। এটি দেহ-মন সম্পর্ক সমস্যার একটি
যুক্তিসংগত সমাধান প্রদান করে, যেখানে উভয়কে একই মূল
বাস্তবতার দুটি রূপ হিসেবে দেখা হয়।
6.
জ্ঞানের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদ হিসেবে বিচারবাদ বিশ্লেষণ করো
?
** বিচারবাদ দর্শনের একটি
গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ, যা জ্ঞানের উৎপত্তি ও প্রকৃতি নিয়ে
আলোচনা করে। এই মতবাদে বলা হয়, জ্ঞানের মূল উৎস হলো
মানুষের চিন্তা, বিশ্লেষণ ও যুক্তিসঙ্গত বিচারশক্তি। অর্থাৎ মানুষ
ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করলেও প্রকৃত জ্ঞান অর্জিত হয় যখন সে সেই তথ্যগুলো
যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিচার করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
বিচারবাদের মূল ধারণা হলো,
জ্ঞান কেবলমাত্র অনুভূতির ফল নয়, বরং
বুদ্ধির যুক্তিসঙ্গত প্রয়োগের ফল। মানুষ যখন কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করে, তুলনা করে, বিশ্লেষণ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়,
তখনই প্রকৃত জ্ঞান জন্ম নেয়। এই প্রক্রিয়াতেই মানুষের বুদ্ধি ও
যুক্তি কাজ করে, যা তাকে সাধারণ অভিজ্ঞতার ঊর্ধ্বে তুলে
ধরে।
এই মতবাদের প্রবক্তারা মনে করেন, ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা আমাদের কাঁচা উপাদান দেয়, কিন্তু সেই উপাদানকে অর্থবহ জ্ঞানে রূপান্তর করতে যুক্তি ও বিচারবোধ
অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, আমরা চোখে দেখে বা কানে শুনে তথ্য
পাই, কিন্তু কোনটি সত্য, কোনটি
ভ্রান্ত – তা নির্ধারণ করতে আমাদের চিন্তা ও
বিচারবোধ ব্যবহার করতে হয়।
বিচারবাদের অন্যতম ভিত্তি হলো যুক্তিবাদ (Rationalism)। দার্শনিক
দেকার্ত, স্পিনোজা ও
লেইবনিজ এই ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। তারা মনে করতেন, সত্যিকারের জ্ঞান আসে যুক্তি থেকে, কারণ
ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা কখনও কখনও বিভ্রান্তিকর হতে পারে। বিচারবাদের মাধ্যমে মানুষ
অভিজ্ঞতার সীমা অতিক্রম করে সার্বজনীন সত্যে পৌঁছাতে পারে।
তবে বিচারবাদের সীমাবদ্ধতা হলো, এটি কখনও কখনও অভিজ্ঞতার গুরুত্বকে অবহেলা করে। বাস্তব
জ্ঞান অর্জনের জন্য শুধুমাত্র যুক্তি যথেষ্ট নয়; অভিজ্ঞতা
ও পর্যবেক্ষণের সাহায্যও প্রয়োজন। এই কারণে পরবর্তীকালে অভিজ্ঞতাবাদীরা বিচারবাদের
একপাক্ষিকতাকে সমালোচনা করেছেন।
সবশেষে বলা যায়, বিচারবাদ মানুষের চিন্তা, যুক্তি ও বিশ্লেষণ
ক্ষমতার ওপর গভীর আস্থা প্রকাশ করে। এটি শেখায় যে প্রকৃত জ্ঞান জন্মায় যখন মানুষ
ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যকে যুক্তিসঙ্গতভাবে বিশ্লেষণ করে। তাই জ্ঞানের
বিকাশে বিচারবাদের ভূমিকা অপরিসীম, কারণ এটি যুক্তির
শক্তিকে জ্ঞানের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করেছে।
7.
ঈশ্বর অস্তিত্তের পক্ষে যে কোন দুইটি যুক্তি ব্যাখ্যা করো ?
** ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের
জন্য বহু দার্শনিক বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। এর মধ্যে দুটি প্রধান যুক্তি
হলো — কারণতত্ত্বমূলক
যুক্তি এবং উদ্দেশ্যতত্ত্বমূলক যুক্তি। নিচে এই দুইটি যুক্তি
ব্যাখ্যা করা হলো।
প্রথমত, কারণতত্ত্বমূলক যুক্তি অনুযায়ী, পৃথিবীর
প্রতিটি ঘটনারই একটি কারণ আছে। কিছুই অকারণে ঘটে না। যেমন—বৃষ্টি হওয়ার কারণ আছে, গাছ জন্মানোর কারণ আছে। এইভাবে
কারণের শৃঙ্খল ধরে আমরা যখন এগোই, তখন দেখা যায়—সবকিছুর একটি “প্রথম কারণ” থাকা প্রয়োজন,
যে নিজে কোনো কিছুর দ্বারা সৃষ্ট নয়, কিন্তু
যার দ্বারা অন্য সব কিছুর সৃষ্টি হয়েছে। সেই প্রথম কারণই হলো ঈশ্বর। দার্শনিক
অ্যারিস্টটল এই ঈশ্বরকে বলেছেন “অচল চালক” বা “Unmoved Mover”, যিনি সমস্ত গতি ও সৃষ্টি প্রক্রিয়ার মূল উৎস।
দ্বিতীয়ত, উদ্দেশ্যতত্ত্বমূলক যুক্তি অনুযায়ী, এই
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এক বিস্ময়কর শৃঙ্খলা, নিয়ম ও উদ্দেশ্য
বিদ্যমান। সূর্য, চাঁদ, পৃথিবী,
জীবজগৎ—সবকিছুই
এমনভাবে বিন্যস্ত ও সংগঠিত যে জীবন টিকে থাকে। এই নিয়ম ও উদ্দেশ্য কোনো কাকতালীয়
ব্যাপার নয়। যেমন একটি ঘড়ির সূক্ষ্ম গঠন দেখে বোঝা যায় যে এর একজন দক্ষ নির্মাতা
আছেন, তেমনি এই
মহাবিশ্বের নিখুঁত বিন্যাস প্রমাণ করে যে এক মহান বুদ্ধিমান স্রষ্টা আছেন, যিনি সবকিছু পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করেছেন।
সবশেষে বলা যায়, কারণতত্ত্বমূলক যুক্তি ঈশ্বরকে বিশ্বের প্রথম কারণ হিসেবে প্রমাণ করে,
আর উদ্দেশ্যতত্ত্বমূলক যুক্তি ঈশ্বরকে জগতের পরিকল্পনাকারী ও
নিয়ন্ত্রক হিসেবে তুলে ধরে। এই দুই যুক্তিই ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে যৌক্তিক ও
দার্শনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃত।
8.
ইচ্ছা স্বাধীনতা বিষয়ক মতবাদ হিসেবে নিয়ন্ত্রনবাদ ও অনিয়ন্ত্রন বাদ ব্যাখ্যা করো
?
** ইচ্ছার
স্বাধীনতা মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি বোঝায় যে মানুষ কতটা নিজের
ইচ্ছা ও কর্মের নিয়ন্ত্রণে স্বাধীন। এই প্রসঙ্গে দর্শনে দুটি প্রধান মতবাদ
লক্ষ্যণীয়—নিয়ন্ত্রণবাদ এবং অনিয়ন্ত্রনবাদ।
নিয়ন্ত্রণবাদের মতে, মানুষের ইচ্ছা ও কর্মকাণ্ড নির্ধারিত বা পূর্বনির্ধারিত নিয়মের মধ্যে
সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ মানুষের সব কাজ ও সিদ্ধান্ত
কোনো না কোনো কারণ বা প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে ঘটে। এই মতবাদ জড়বাদের সঙ্গে
সম্পর্কিত, যা বলে যে জীবন ও কর্মের সবকিছুর পিছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।
নিয়ন্ত্রণবাদীরা মনে করেন, যদিও মানুষ ইচ্ছা ও কর্ম করে,
তা সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়, বরং
পূর্বশর্তিত বা পরিবেশ ও পরিস্থিতির প্রভাবে নিয়ন্ত্রিত।
অন্যদিকে, অনিয়ন্ত্রনবাদ বা স্বৈর ইচ্ছাবাদ বলে যে মানুষ তার ইচ্ছা ও কর্মে পূর্ণ
স্বাধীন এবং বাইরের কোনো শক্তি বা কারণ দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। এই মতবাদ মানুষের নৈতিক দায়বোধ ও স্বাধীনতার গুরুত্বকে
তুলে ধরে। অনিয়ন্ত্রনবাদের অনুসারীরা মনে করেন, মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত, চিন্তা
ও কাজ নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, এবং তার কর্মের জন্য
নিজেই দায়ী।
সংক্ষেপে বলা যায়, নিয়ন্ত্রণবাদ মানুষের ইচ্ছাকে পূর্বনির্ধারিত বা সীমাবদ্ধ হিসেবে দেখে,
যেখানে জড়বাদের প্রভাব থাকে। অনিয়ন্ত্রনবাদ মানুষের ইচ্ছা ও
কর্মকে পূর্ণ স্বাধীন হিসেবে বিবেচনা করে, যা নৈতিক
দায়িত্ব ও স্বায়ত্তশাসনের উপর জোর দেয়। এই দুই মতবাদই ইচ্ছার স্বাধীনতা বিষয়ক
দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ করে।
9.
মুল্য কি ?
সতঃ মুল্য ও পরতঃ মুল্য ব্যাখ্যা করো ?
** মূল্য হলো কোনো বস্তু, কাজ বা ধারণার গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা বা
সৌন্দর্যের মান। এটি মানুষের চেতনা ও অনুভূতির উপর নির্ভরশীল এবং
সমাজ, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার প্রভাব দ্বারা নির্ধারিত হয়। মানুষ কোনো বস্তু বা
কার্যকে শুধুমাত্র তার পদার্থগত বা বাহ্যিক দিক দেখে মূল্যায়ন করে না, বরং তার উপযোগিতা, প্রভাব ও নৈতিক দিক বিবেচনা
করে তার মূল্য নির্ধারণ করে।
মূল্যকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—সতঃমূল্য (Intrinsic Value) এবং পরতঃমূল্য (Extrinsic
Value)।
সতঃমূল্য বলতে বোঝায় কোনো বস্তু, কাজ বা ধারণার নিজের মধ্যে থাকা প্রকৃত মূল্য, যা তার স্বাভাবিক গুণাবলির কারণে বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, সত্য, ন্যায় বা সৌন্দর্য—এগুলো নিজের মধ্যে মূল্যবান, অর্থাৎ এগুলোর কোনো বাহ্যিক প্রভাব
ছাড়াই এদের গুণাবলিই মূল্য নির্ধারণ করে।
পরতঃমূল্য বলতে বোঝায় কোনো বস্তু বা কাজের অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা উপকারের
জন্য থাকা মূল্য। উদাহরণস্বরূপ, টাকা বা শিক্ষার মূল্য তাদের ব্যবহার
বা সুবিধার কারণে নির্ধারিত হয়। এগুলো নিজের মধ্যে মূল্যবান নয়, বরং অন্য কোনো কার্য বা ফলাফলের জন্য মূল্যবান।
সংক্ষেপে, সতঃমূল্য হলো নিজের মধ্যে থাকা মূল্য, আর
পরতঃমূল্য হলো কোনো বাহ্যিক উদ্দেশ্য বা প্রভাবের কারণে থাকা মূল্য। এই ধারণাগুলো মূল্যবোধ ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে
গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষের জীবন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে।
10.
সতত্যা সম্পর্কিত মতবাদ হিসেবে অনুরুপবাদ ব্যাখ্যা করো ?
** সত্যতা
সম্পর্কিত দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ হলো অনুরুপবাদ। এই মতবাদে বলা হয় যে,
কোনো বিবৃতি বা ধারণা তখনই সত্য, যখন তা
বাস্তবতার সঙ্গে মিল বা অনুরুপ হয়। অর্থাৎ, সত্য হলো সেই
মানদণ্ড যার মাধ্যমে আমাদের বক্তব্য বা ধারণা বাস্তব জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ
কিনা তা যাচাই করা যায়।
অনুরুপবাদের মূল ধারণা হলো, মানুষের ভাষা, চিন্তা বা
বিবৃতি যদি বাস্তবের প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত করে, তবে
সেটি সত্য। উদাহরণস্বরূপ, “পানি উষ্ণ” এই বাক্যটি তখনই সত্য, যখন বাস্তবে পানি উষ্ণ
থাকে। যদি বাস্তবের সঙ্গে মিল না থাকে, তবে বিবৃতিটি
মিথ্যা।
এই মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন আর্থার ফেলকনির মতো দার্শনিকরা। তারা
যুক্তি দেখিয়েছেন যে, মানুষের জ্ঞান ও ধারণা বাস্তবতার প্রতিফলন হলে সেটি বিশ্বাসযোগ্য এবং
কার্যকর। অনুরুপবাদে সত্যের মানদণ্ড বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য। এটি সত্যের বস্তুনিষ্ঠ দিককে গুরুত্ব দেয় এবং আমাদের
ধারণা ও বাস্তব জগতের সম্পর্ককে প্রাধান্য দেয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, অনুরুপবাদে সত্যের সংজ্ঞা হলো যে ধারণা বা বিবৃতি বাস্তবতার সঙ্গে মিলে
যায়, সেটিই সত্য। এটি আমাদের চিন্তা ও ভাষাকে বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কিত রাখে এবং জ্ঞান ও
যুক্তির ভিত্তিকে দৃঢ় করে।
11.
উন্মেষমুলক বিবর্তনবাদ ব্যাখ্যা করো
?
** উন্মেষমূলক বিবর্তনবাদ হলো
বিবর্তনের একটি দর্শনীয় মতবাদ যা জীবন ও জগতের পরিবর্তনকে সৃষ্টিশীল ও উদ্ভাবনশীল
প্রক্রিয়া হিসেবে দেখায়। এই মতবাদ অনুযায়ী, বিবর্তন
কেবল যান্ত্রিক বা এলোমেলো প্রক্রিয়ার ফল নয়, বরং
জীবনের ভেতরের শক্তি ও সৃজনশীলতা দ্বারা পরিচালিত হয়।
এই তত্ত্বের মূল ধারণা হলো, জীবজগত ক্রমাগত নতুন রূপ, বৈশিষ্ট্য
ও সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। মানুষ, প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতিটি
সত্তা তার অন্তর্নিহিত শক্তি ও অভিযোজন ক্ষমতার মাধ্যমে নিজেকে পরিবর্তিত ও বিকশিত
করে। ফরাসি দার্শনিক হেনরি বার্গসন এই তত্ত্বের প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি বলেন,
জীবনের বিকাশে একটি অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি বা “এলান ভিটাল” (Élan Vital) কাজ করে, যা সৃষ্টিশীলভাবে
জীবের রূপান্তর ও উন্নয়ন ঘটায়।
উন্মেষমূলক বিবর্তনবাদ শুধুমাত্র পদার্থগত পরিবর্তনকে নয়, বরং জীবনের মানসিক ও চেতনামূলক
দিককেও বিবর্তনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এটি জীবনকে একটি ধারাবাহিক, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনশীল প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখায়।
সংক্ষেপে বলা যায়, উন্মেষমূলক বিবর্তনবাদ জীবনের বিকাশকে সৃষ্টিশীল ও উদ্ভাবনশীল
প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে, যা কেবল প্রাকৃতিক কারণ
নয়, বরং জীবনের অন্তর্নিহিত শক্তি ও উদ্ভাবনক্ষমতার ফল।
এটি জীবনের পরিবর্তন ও উন্নয়নের গভীর অর্থ ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে।
12.
সত্তা কি ?
একত্ববাদ ও দ্বৈতবাদ আলোচনা করো
?
** সত্তা হলো
যে কোনও বস্তুর অস্তিত্ব, প্রকৃতি বা হওয়ার অবস্থা। দর্শনে সত্তার অর্থ
শুধু পদার্থ নয়, বরং জীব, মন, চিন্তা
ও প্রকৃতির যে কোনও মূল উপাদান যা বাস্তবতায় বিদ্যমান। সত্তা বোঝার মাধ্যমে মানুষ
জগতের প্রকৃতি, জীবন ও অস্তিত্বের মৌলিক ধারণাগুলো
অনুধাবন করতে পারে।
একত্ববাদ হলো সেই মতবাদ যা বলে, বাস্তব জগৎ একক সত্তার দ্বারা গঠিত। একত্ববাদের
অনুসারীরা মনে করেন, সমস্ত প্রকৃতি, জীবন ও চেতনাশক্তি একক মূল বা সত্তার ভিন্ন রূপ মাত্র। উদাহরণস্বরূপ,
স্পিনোজা তার দার্শনিক তত্ত্বে বলেন যে ঈশ্বর বা প্রকৃতি একক,
এবং দেহ ও মন হলো সেই একক সত্তার দুটি ভিন্ন প্রকাশ। একত্ববাদের
মূল ধারণা হলো, বহু দৃষ্টিকোণ থাকা সত্ত্বেও সবকিছু মূলত
একে।
দ্বৈতবাদ হলো সেই মতবাদ যা বলে, বাস্তবতায় দুই প্রকার স্বতন্ত্র সত্তা বিদ্যমান।
সাধারণত এটি দেহ এবং মন বা পদার্থ এবং চেতনার মধ্যে পার্থক্য আনে। দ্বৈতবাদ অনুসারীরা
মনে করেন, মন এবং দেহ আলাদা সত্তা এবং প্রতিটি
স্বতন্ত্রভাবে অস্তিত্ব রাখে। রেনে দেকার্ত এই মতের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন। তিনি
বলেন, মন চিন্তাশীল (thinking
substance), আর দেহ প্রসারিত (extended substance), এবং এই দুইটি একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র হলেও একসাথে
কার্যকর হয়।
সংক্ষেপে, একত্ববাদ বলে যে সবকিছু একক মূল সত্তা থেকে উদ্ভূত, যেখানে বৈচিত্র্য কেবল রূপগত; আর দ্বৈতবাদ বলে
যে বাস্তবতায় দুই প্রকার স্বতন্ত্র সত্তা বিদ্যমান, যা
একে অপরের থেকে পৃথক। এই দুটি মতবাদ দর্শনে সত্তার প্রকৃতি ও জগতের কাঠামো বোঝার জন্য
গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে।


0 মন্তব্যসমূহ