ক বিভাগ প্রশ্ন উত্তর
1.
বাংলাদেশের সব থেকে উচু পর্বত শৃঙ্গের নাম কি ?
** বাংলাদেশের
সবচেয়ে উচু পর্বত শৃঙ্গ হলো তাজিংডং
2.
কোন প্রচিন গ্রন্থে সর্ব প্রথম বঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায় ?
** প্রাচীন গ্রন্থ পঞ্জিকায় বা ভরত পুরাণে সর্বপ্রথম বঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। ,
সর্বপ্রথম 'বঙ্গ' নামের উল্লেখ পাওয়া যায় ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে।
3.
অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমুন্ত্রি কে ছিলেন ?
**
অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আবুল কাশেম ফজলুল হক
4.
লাহোর প্রস্থাব কে উথাপন করেন ?
**
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবটি মুসলিম
লীগের পক্ষ থেকে উপস্থাপন করেন
5.
পূর্ব বাংলার প্রথম গভর্নর কে ছিলেন ?
**
পূর্ব বাংলার প্রথম গভর্নর ছিলেন স্যার ফ্রেডেরিক চালমার্স
বোর্ন (Sir Frederick Chalmers Bourne)
6.
বাংলাদেশের উপর দিয়ে কোন ভউগলিক রেখা অতিক্রম করে ?
** বাংলাদেশের প্রায় মধ্যভাগ দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা (Tropic of Cancer) অতিক্রম করেছে।
7.
বঙ্গভঙ্গ কখন হয়
?
** প্রথম বঙ্গভঙ্গ
হয় ১৯০৫ সালে।
8.
কার নেতৃীতে তমুদ্দুন মজলিস গঠিত হয়
?
** তমদ্দুন মজলিস অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে গঠিত হয়।
9.
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট কতো দফা ঘোষণা করেন ?
** ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট একুশ দফা (২১ দফা) কর্মসূচি
ঘোষণা করে।
10.
পাকিস্থানের মৌলিক গনতন্ত্র কে চালু করেন ?
** পাকিস্তানের মৌলিক গণতন্ত্র চালু করেন সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান।
11.
L F O এর পূর্ণ রুপ কি
?
**
Legal Framework Order (লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার), অর্থাৎ আইনগত কাঠামো আদেশ।
12.
ভাষা আন্দলনের দুজন শহিদের নাম লিখ
?
** আবুল বরকত , রফিকউদ্দিন আহমদ
13.
বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে কোন ভাষা থেকে ?
** বাংলা ভাষার উদ্ভব প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা থেকে হয়েছে
14.
দ্বি জাতি তত্তের প্রবর্তক কে ?
** দ্বি-জাতি তত্ত্বের প্রধান প্রবর্তক হলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
15.
১৯৭১ সালের অস্থায়ি সরকারের প্রধান মন্ত্রি কে ছিলেন ?
**১৯৭১ সালের অস্থায়ী সরকারের (মুজিবনগর সরকার) প্রধান মন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
16.
ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব কোথায় ও কতো সালে উত্থাপিত হয় ?
** ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ অবিভক্ত ভারতের লাহোরে উত্থাপিত হয়
17.
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ কবে গঠিত হয়
?
**
প্রথম 'রাষ্ট্রভাষা
সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়:
১৯৪৭ সালের ১ অক্টোবর
18.
অখণ্ড স্বাধীন বাংলা গঠনের প্রস্থাবক কে ছিলেন ?
**
অখণ্ড স্বাধীন বাংলা গঠনের প্রধান প্রস্তাবক বা উদ্যোক্তা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
19.
PODO, EBDO, এর পূর্ণ রুপ কি
?
**
PODO:
Public Officers' Disqualification Order (পাবলিক অফিসার্স ডিসকোয়ালিফিকেশন
অর্ডার)
EBDO: Elective Bodies Disqualification Order (ইলেক্টিভ
বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডার)
20.
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রথম কতো সালে উত্তোলিত হয় ?
** বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলিত
হয় ২ মার্চ, ১৯৭১
21.
বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান কারি প্রথম দেশ কনটি ?
**
ভুটান
22.
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ কয়টি সেক্টরে বিভক্ত ছিল ?
**
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে
সমগ্র ভূখণ্ডকে ১১টি সেক্টরে (যুদ্ধক্ষেত্র) বিভক্ত করা হয়েছিল।
23.
কোন আইন দ্বারা ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয় ?
** ভারতীয় স্বাধীনতা আইন, ১৯৪৭
খ বিভাগ প্রশ্ন উত্তর
1.
বাংলাদেশের ভউগলিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে লিখ ?
**
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত । উত্তর, পশ্চিম ও
পূর্বে: ভারত (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম
রাজ্য)।
দক্ষিণ-পূর্বে: মিয়ানমার (বার্মা)।
দক্ষিণে: বঙ্গোপসাগর।
বাংলাদেশের মাঝ বরাবর কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করেছে, ফলে দেশটি ক্রান্তীয় অঞ্চলের
অন্তর্ভুক্ত।
ভূ-প্রকৃতি: দেশটি প্রধানত নদী বিধৌত সমভূমি। এটি গঙ্গা (পদ্মা), ব্রহ্মপুত্র
(যমুনা), ও মেঘনা নদী এবং তাদের শাখা-প্রশাখা দ্বারা
বাহিত পলল দ্বারা গঠিত এক বিশাল ব-দ্বীপ। সমতল ভূমি হওয়ার কারণে অধিকাংশ স্থানই
নিচু ও বন্যাপ্রবণ।
দেশের উত্তর-পূর্ব (সিলেট) এবং দক্ষিণ-পূর্ব (পার্বত্য চট্টগ্রাম)
অঞ্চলে কিছু পাহাড়ি এলাকা রয়েছে, যা টারশিয়ারি যুগের।
এছাড়াও কিছু পুরাতন পলল দ্বারা গঠিত উচ্চভূমি রয়েছে, যেমন: বরেন্দ্র
ভূমি এবং মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় (প্লাইস্টোসিন কালের
সোপানসমূহ)।
নদ-নদী: বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ
প্রায় ৭০০টি ছোট-বড় নদ-নদী বাংলাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে আছে। এই নদীগুলো দেশের অর্থনীতি, কৃষি ও
যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জলবায়ু: এখানে ক্রান্তীয়
মৌসুমী জলবায়ু
বিরাজ করে। আবহাওয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো - উষ্ণ
ও আর্দ্র গ্রীষ্মকাল এবং শুষ্ক ও মৃদু শীতকাল। প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় বর্ষাকালে।
2.
বাংলা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে লিখ ?
** বাংলা নামটি মূলত 'বঙ্গ' বা 'Vanga' নামক একটি প্রাচীন জনপদ বা অঞ্চলের নাম থেকে এসেছে। এই
নামটির উৎপত্তির পেছনে প্রধানত দুটি মতবাদ প্রচলিত:
পুরাণ ও সাহিত্যভিত্তিক মতবাদ
'বঙ্গ' জনপদ: প্রাচীন
ভারতীয় পুরাণ ও মহাকাব্যগুলিতে, যেমন মহাভারতে, এই অঞ্চলের নাম বঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, আর্য-পূর্ব দ্রাবিড় গোষ্ঠীভুক্ত এক জনগোষ্ঠী বা গোত্রের নাম ছিল
'বঙ্গ', যারা এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন
করেছিল। এই গোষ্ঠীর নামানুসারেই অঞ্চলটির নাম বঙ্গ হয়।
বালিরাজার পুত্র: কিংবদন্তি অনুসারে, অসুরদের গুরু শুক্রাচার্যের নির্দেশে
বালিরাজার পাঁচ পুত্র - অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুহ্ম ও পুণ্ড্র - পাঁচটি রাজ্য
প্রতিষ্ঠা করেন। এদের মধ্যে বঙ্গ রাজ্যটি প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমান বাংলার পূর্বাংশে।
ভাষাগত ও ঐতিহাসিক মতবাদ
'আল' বা 'আইল' সংযোজন: বাংলা নামটি 'বঙ্গ'-এর সঙ্গে পারস্য বা ফার্সি ভাষার
'আল' (আ'ল) শব্দের
সংযোগে গঠিত হয়েছে।
'আল' বা 'আইল' শব্দের অর্থ হলো বাঁধ, জমির কিনারা বা উঁচু ভিটা। বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমি ছিল নদীবাহিত পলল
দ্বারা গঠিত নিচু জলাভূমি, যেখানে চাষাবাদের জন্য বা
বন্যার হাত থেকে রক্ষার জন্য ছোট ছোট আইল (জমির কিনারা/বাঁধ) তৈরি করা হতো।
ফার্সি বা মুসলিম শাসনামলে (তুর্কি-আফগান সময়কালে), এই অঞ্চলের পরিচিতি বোঝাতে স্থানীয় 'বঙ্গ' নামের সাথে ফার্সি 'আল' শব্দটি যুক্ত করে 'বঙ্গাল' বা 'বেঙ্গাল'
নামটি প্রচলিত হয়।
বঙ্গাল → বাঙ্গালা (Baṅgālā) → বাংলা (Bānlā)
সময়ের সাথে সাথে এবং বিভিন্ন ভাষার প্রভাবে 'বঙ্গাল' নামটি
বিবর্তিত হয়ে 'বাঙ্গালা' বা
'বেঙ্গলা' (পর্তুগিজ ও ইংরেজদের দ্বারা)
এবং পরিশেষে 'বাংলা' নামে পরিচিত
হয়।
3.
আগরতলা মামলা কি ছিল ?
** আগরতলা মামলা একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা, যা ১৯৬৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দায়ের করা
হয় ।
আগরতলা মামলা (১৯৬৮)
আগরতলা মামলা (আনুষ্ঠানিক নাম: রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও
অন্যান্য) ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) স্বাধীনতার লক্ষ্যে
সংগঠিত একটি ষড়যন্ত্র মামলা।
মামলাটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমান-সহ ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও বেসামরিক
কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়ের করা, যাদের বিরুদ্ধে ভারতের
সহায়তায় পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়।
অভিযুক্তরা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় গিয়ে ভারতীয়
পক্ষের সাথে মিলিত হয়ে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন
করার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।
মামলাটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি পূর্ব
পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানের
জনপ্রিয়তাকে আকাশচুম্বী করে তোলে। তীব্র ছাত্র-জনতার আন্দোলনের (ঊনসত্তরের
গণ-অভ্যুত্থান) মুখে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সরকার মামলাটি প্রত্যাহার করতে ও শেখ
মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন।
এই মামলার মাধ্যমেই শেখ মুজিবুর রহমান 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি লাভ করেন এবং এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী
ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত।
4.
অপারেশন সার্চলাইট এর উপর একটি টিকা লেখ ?
** অপারেশন
সার্চলাইট
অপারেশন সার্চলাইট ছিল ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে তৎকালীন পশ্চিম
পাকিস্তান সরকার (সামরিক জান্তা) কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ)
জনগণের উপর পরিচালিত একটি সুচিন্তিত ও নৃশংস সামরিক অভিযান। এর মূল লক্ষ্য ছিল
বাঙালিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করা এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে
রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধান করা।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: এই সামরিক অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শেখ
মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে নির্মূল করা, এবং পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র, শিক্ষক, পুলিশ ও ইপিআর-এর মতো প্রতিরোধকারী গোষ্ঠীগুলোকে ভয়াবহভাবে দমন করে
বাঙালিদের জাগরণকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।
কার্যক্রম: ২৫শে মার্চ গভীর রাতে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার পিলখানা,
রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ট্যাঙ্ক ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে
আক্রমণ শুরু করে। নির্বিচারে সাধারণ জনগণ, ছাত্র, শিক্ষক ও নিরস্ত্র পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হয়।
ফলাফল: এই অভিযান রাতারাতি হাজার হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নেয় এবং
এটিই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাথমিক ও প্রধান অনুঘটক। এই নৃশংসতার ফলস্বরূপ
শেখ মুজিবুর রহমান ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এবং
আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: অপারেশন
সার্চলাইট-এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যে গণহত্যা শুরু করে, তা বাঙালি
জাতিকে চূড়ান্তভাবে ঐক্যবদ্ধ করে এবং নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি
স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
5.
মুক্তিযুদ্ধের যে কোন একটি সেক্টর সম্পর্কে আলোচনা করো ?
**
মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাদেশের সমগ্র
ভৌগোলিক এলাকাকে সামরিক কৌশলগত দিক থেকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। নিচে ২নং
সেক্টর সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
২নং সেক্টর: ঢাকার প্রবেশদ্বার
২নং সেক্টর ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও যুদ্ধবহুল
রণাঙ্গন, যা রাজধানী ঢাকার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল।
এলাকা: এই সেক্টরের আওতাভুক্ত এলাকা ছিল ঢাকা জেলা, কুমিল্লা
জেলা, নোয়াখালী জেলা এবং ফরিদপুর জেলার অংশবিশেষ।
ভারতের ত্রিপুরার মেলাঘর ছিল এই সেক্টরের সদর দপ্তর।
সেক্টর কমান্ডার: প্রথমে ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ (১০ এপ্রিল – ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১) এবং
পরবর্তীতে মেজর এ টি এম হায়দার (২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ – ১৪
ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২)।
ঢাকার মুক্তি: রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে অবস্থিত হওয়ায় এই সেক্টরের
প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং গেরিলা আক্রমণের মাধ্যমে
পাকিস্তানি বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তোলা।
ক্র্যাক প্লাটুন: এই সেক্টরের অধীনেই গঠিত হয়েছিল অন্যতম দুর্ধর্ষ গেরিলা
দল 'ক্র্যাক প্লাটুন'। এই গেরিলারা প্রশিক্ষণ নিয়ে
ঢাকা শহরে অসংখ্য দুঃসাহসিক ও সফল অভিযান পরিচালনা করে, যা
পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয় এবং বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের খবর ছড়িয়ে দিতে
সাহায্য করে।
গেরিলা যুদ্ধ: ভৌগোলিক অবস্থান ও ঘনবসতির কারণে এখানে গেরিলা যুদ্ধ ছিল
অত্যন্ত কার্যকর। নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি প্রায় ৩৫ হাজার গণবাহিনীর সদস্য এই
সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন।
উল্লেখযোগ্য অভিযান: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পাকিস্তানি সরবরাহ লাইন
বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া এবং সলদা নদী, মন্দাভব, শালদা
নদী এবং মতিনগর সাব-সেক্টরে অসংখ্য সফল সম্মুখ যুদ্ধ পরিচালনা করা এই সেক্টরের
প্রধান সাফল্যগুলোর মধ্যে অন্যতম।
এই সেক্টরের
বীরত্বপূর্ণ আক্রমণগুলো মুক্তিযুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকা মুক্ত
করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
6.
সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা বলতে কি বুঝ ?
**
সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা
এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি সমাজের মানুষ তাদের আচরণ, বিশ্বাস,
ধর্মীয় আচার, ভাষা, শিল্প, রীতিনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিদেশী বা
ভিন্ন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে নিজেদের ঐতিহ্যের সাথে মিশিয়ে নেয়। এর ফলে
কোনো সংস্কৃতি সম্পূর্ণরূপে বিলীন না হয়ে, বরং একটি সমন্বিত
বা হাইব্রিড (Hybrid) রূপ পরিগ্রহ করে।
উপাদানসমূহ: এই সমন্বয় কেবল ধর্ম বা লোকাচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; খাদ্য,
পোশাক, সঙ্গীত, স্থাপত্য এবং ভাষার মধ্যেও এর প্রকাশ দেখা যায়।
ধর্ম: বিভিন্ন স্থানীয় লোকাচারের সাথে প্রধান ধর্মগুলির (যেমন ইসলাম, খ্রিস্টান,
বৌদ্ধ বা হিন্দুধর্ম) মিশ্রণ।
বাঙালির সংস্কৃতি: বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলাম, হিন্দুধর্ম ও
অন্যান্য আঞ্চলিক বিশ্বাসের সমন্বয় দেখা যায়, যেমন
লোকশিল্প, মেলা, এবং বিভিন্ন
সামাজিক অনুষ্ঠানে। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্য ও পীর-পূজা
ছিল হিন্দু-মুসলিমের বিশ্বাসের সমন্বয়ের ফল।
খাদ্য ও পোশাক: ভারতীয় উপমহাদেশে মোগল ও ইউরোপীয় রন্ধনশৈলীর মিশ্রণে
নতুন খাবারের সৃষ্টি,
বা পাশ্চাত্য পোশাকের সাথে স্থানীয় পোশাকের সংমিশ্রণ।
সংক্ষেপে, সমন্বয়বাদিতা
হলো সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে এক প্রকার 'দেওয়া-নেওয়া'
প্রক্রিয়া, যা একটি সমাজকে আরও বেশি
বহুত্ববাদী ও গতিশীল করে তোলে। এটি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সহাবস্থানের একটি
শক্তিশালী প্রমাণ।
7.
১৯৬৯ সালের গনঅভ্যুথানের লক্ষ্য কি ছিল ?
**
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রধান লক্ষ্য ছিল তৎকালীন সামরিক
স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের পতন ঘটানো এবং পূর্ব পাকিস্তানের
জনগণের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক
অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যসমূহ
এই গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্যগুলো ছিল বহুমাত্রিক, যা মূলত দুটি
প্রধান ভাগে বিভক্ত ছিল:
১. রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক লক্ষ্য
·
আইয়ুব খানের পতন: তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল
আইয়ুব খানের সামরিক শাসন এবং তাঁর প্রবর্তিত 'মৌলিক গণতন্ত্র' ব্যবস্থার অবসান ঘটানো।
·
শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়
অভিযুক্ত শেখ মুজিবুর রহমান-সহ সকল রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তি নিশ্চিত করা।
·
গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা: দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র
ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের মৌলিক ভোটাধিকারসহ সকল গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
·
স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা: ছয় দফার ভিত্তিতে পূর্ব
পাকিস্তানের জন্য পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা, যার মাধ্যমে
কেন্দ্রীয় সরকারের শোষণ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়।
২. অর্থনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্য
·
অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের
মধ্যে বিদ্যমান তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদের ওপর
এ অঞ্চলের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
·
শিক্ষা দাবি বাস্তবায়ন: ছাত্রদের দেওয়া ১১ দফার ভিত্তিতে
শিক্ষাসংক্রান্ত দাবিগুলো (যেমন অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা) বাস্তবায়ন
করা।
·
শ্রমিক-কৃষকের অধিকার: শ্রমিক ও কৃষকের ন্যায্য অধিকার
এবং উন্নত জীবনযাত্রার দাবিগুলো পূরণ করা।
সংক্ষেপে,
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির সম্মিলিত
আকাঙ্খার বহিঃপ্রকাশ।
8.
বসু সোহরাওদি চুক্তি কি ?
**
বসু-সোহরাওয়ার্দী চুক্তি ছিল ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের
প্রাক্কালে বাংলাকে অখণ্ডিত রেখে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে
প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে নেওয়া একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উদ্যোগ। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে
'অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা পরিকল্পনা' বা
'যুক্তবঙ্গ' নামে পরিচিত।
বসু-সোহরাওয়ার্দী চুক্তি (১৯৪৭)
·
নেতৃত্ব: এই চুক্তির মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তৎকালীন বাংলার
প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং প্রখ্যাত কংগ্রেস
নেতা শরৎচন্দ্র বসু। মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে আবুল হাশিম এবং কংগ্রেসের
পক্ষ থেকে কিরণশঙ্কর রায়ও এই চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
·
মূল লক্ষ্য: হিন্দু ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে
বাংলাকে বিভক্ত করে ভারত বা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত না করে, এটিকে একটি স্বাধীন
রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলার অর্থনৈতিক অখণ্ডতা রক্ষা
করা এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাত এড়ানো।
·
প্রস্তাবের শর্তাবলী (সংক্ষেপে): ১. সার্বভৌম বাংলা: বাংলা
হবে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, যা ভারত বা পাকিস্তানের কোনোটিরই অংশ
হবে না। ২. যৌথ নির্বাচন: প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে যৌথ নির্বাচনের মাধ্যমে
আইনসভা গঠিত হবে। ৩. ক্ষমতার সমতা: অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভায় মুসলিম ও হিন্দু
(তফসিলি হিন্দুসহ) সম্প্রদায়ের সমান সংখ্যক সদস্য থাকবে। ৪. পদ বণ্টন: মুখ্যমন্ত্রী
হবেন মুসলিম এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হবেন হিন্দু।
·
ব্যর্থতা: এই চুক্তিটি বাংলার অভ্যন্তরে ব্যাপক সমর্থন
পেলেও, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা এর তীব্র বিরোধিতা করে।
অন্যদিকে, মুসলিম লীগের একাংশও (যেমন খাজা নাজিমুদ্দিনের
গোষ্ঠী) এর প্রতি অনাগ্রহী ছিল। ফলস্বরূপ, কেন্দ্রীয়
নেতৃত্বের বিরোধিতার মুখে এই পরিকল্পনা কার্যকর হতে পারেনি এবং ১৯৪৭ সালে বাংলা
বিভক্ত হয়ে পূর্ব বাংলা (পাকিস্তান) ও পশ্চিমবঙ্গ (ভারত) সৃষ্টি হয়।
9.
যুক্তফ্রন্ট কেন গঠিত হয়েছিল ?
যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল মূলত ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক
পরিষদের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে এবং পূর্ব
পাকিস্তানের জনগণের আঞ্চলিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দাবিগুলো প্রতিষ্ঠা করার
জন্য।
যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রধান কারণসমূহ
১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ)-এর উদ্যোগে এই
নির্বাচনী জোট গঠিত হয়। এর গঠনের মূল কারণগুলো ছিল:
·
মুসলিম লীগের অজনপ্রিয়তা ও ব্যর্থতা: পাকিস্তান
প্রতিষ্ঠার পর থেকে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক উভয় মুসলিম লীগ সরকারই পূর্ব
পাকিস্তানের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি,
এবং জনগণের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ ছিল।
·
ভাষা আন্দোলনের প্রভাব: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সরকারের
কঠোর দমন-পীড়ন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে। মুসলিম লীগ
সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি প্রত্যাখ্যান করায় দলটি গণবিচ্ছিন্ন হয়ে
পড়ে।
·
অর্থনৈতিক বৈষম্য: পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দ্বারা
পূর্ব পাকিস্তানের উপর চালানো তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সম্পদ পাচার জনগণের
মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল।
·
গণতান্ত্রিক অধিকারের অভাব: দীর্ঘদিন ধরে প্রাদেশিক
নির্বাচন স্থগিত রাখা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত করে রাখা ক্ষমতাসীন
মুসলিম লীগকে একনায়কতান্ত্রিক করে তুলেছিল।
·
ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা: মুসলিম লীগকে
নির্বাচনে পরাজিত করতে হলে বিক্ষিপ্ত বিরোধী দলগুলোর একটি ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী
মোর্চা গঠন করা অপরিহার্য ছিল। তাই আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক
পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ও গণতন্ত্রী দল - এই চারটি প্রধান দল মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে।
·
২১-দফার মাধ্যমে জনগণের আশা পূরণ: যুক্তফ্রন্ট তাদের 'একুশ দফা'
নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা,
জমিদার প্রথা বিলোপ, পাটশিল্প জাতীয়করণ
এবং পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার মতো গণদাবিগুলো
উত্থাপন করে জনগণের বিপুল সমর্থন লাভ করে।
সংক্ষেপে,
যুক্তফ্রন্ট ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা,
সাংস্কৃতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীকী রূপ যা ১৯৫৪
সালের নির্বাচনে এক ব্যালট বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিল।
10.
লাহোর প্রস্থাবের মূল প্রতিপদ্য বিষয় কি ছিল ?
**যদিও লাহোর প্রস্তাবের মূল বক্তব্য ছিল একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা, কিন্তু পরবর্তীতে
নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ১৯৪৬ সালের দিল্লি কনভেনশনে এই প্রস্তাবকে সংশোধন করে এবং 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ' এর পরিবর্তে 'একটি স্বাধীন
সার্বভৌম রাষ্ট্র' গঠনের সিদ্ধান্ত
নেয়। এই সংশোধনের ফলস্বরূপ ১৯৪৭ সালে পূর্ব ও পশ্চিম অংশ নিয়ে 'পাকিস্তান' নামক একটি মাত্র
রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। এই সংশোধনীর বিরুদ্ধেই পূর্ব বাংলার নেতারা পরবর্তীকালে
স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
11.
মৌলিক গনতন্ত্র কি ? জাতীয়তাবাদ বলতে কি বুঝ ?
মৌলিক গণতন্ত্র
মৌলিক গণতন্ত্র ছিল
একটি বিশেষ শাসন ব্যবস্থা যা পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান কর্তৃক ১৯৫৯
সালের ২৭ অক্টোবর প্রবর্তিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্রকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে
দেওয়া।
এটি ছিল পাঁচ
স্তরবিশিষ্ট একটি স্থানীয় সরকার পদ্ধতি, যার নিম্ন স্তর থেকে নির্বাচিত
প্রতিনিধিদের (মৌলিক গণতন্ত্রী) নিয়ে উচ্চ স্তরগুলো গঠিত হত। এই ব্যবস্থার
মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পরোক্ষভাবে দেশের প্রেসিডেন্ট
নির্বাচনে ভোট দিত।
পাকিস্তানের
গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের পতনের সাথে এই
ব্যবস্থারও অবসান ঘটে।
জাতীয়তাবাদ
জাতীয়তাবাদ বলতে
সাধারণভাবে একটি নির্দিষ্ট জাতিসত্তা বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান ঐক্যের অনুভূতি, স্বদেশের
প্রতি ভালোবাসা, গৌরব এবং মানসিক বন্ধনকে বোঝায়।
এই ঐক্যের ভিত্তি হতে
পারে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য,
ভৌগোলিক অবস্থান, ধর্ম, রাজনৈতিক আদর্শ বা এগুলোর সম্মিলিত প্রভাব। এটি এমন একটি আদর্শ যেখানে
জাতিকে মানব সমাজের কেন্দ্রীয় অবস্থানে স্থাপন করা হয় এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা
ও জাতির অর্জনসমূহকে সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। জাতীয়তাবাদ একটি মানসিক
ধারণা যা কোনো জনসমাজকে অন্যান্য জনসমাজ থেকে পৃথক করে।
12.
অখণ্ড স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র গঠনের উদ্যেগ সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখ ?
অখণ্ড স্বাধীন
বাংলা রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ
শাসনের অবসানের প্রাক্কালে যখন ভারত বিভক্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন বাংলা
প্রদেশকে দ্বিখণ্ডিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কিছু বিশিষ্ট বাঙালি নেতা
একটি অখণ্ড, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ
নেন। এটিই 'অখণ্ড স্বাধীন বাংলা আন্দোলন' বা 'যুক্তবঙ্গ পরিকল্পনা' নামে পরিচিত।
মূল পরিকল্পনাকারী ও উদ্দেশ্য:
·
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী: তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী
এবং মুসলিম লীগ নেতা। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবিভক্ত বাংলাকে
স্বাধীন রাষ্ট্র করার পরিকল্পনা পেশ করেন।
·
শরৎচন্দ্র বসু: বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের নেতা। তিনি
প্রায় একই সময়ে 'সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক বাংলা প্রজাতন্ত্রের' প্রস্তাব
উত্থাপন করেন।
·
অন্যান্য সমর্থক: আবুল হাশিম (বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম
লীগের সম্পাদক) এবং কিরণশঙ্কর রায় (বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার কংগ্রেস সংসদীয়
দলনেতা) এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ব্যর্থতার কারণ:
এই উদ্যোগটি বেশ
কিছুদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত এটি ব্যর্থ হয়। ব্যর্থতার প্রধান
কারণগুলোর মধ্যে ছিল:
·
সর্বভারতীয় কংগ্রেসের বিরোধিতা: বিশেষ করে সর্দার বল্লভ
ভাই প্যাটেল ও জওহরলাল নেহরু এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁরা একে মুসলিম
আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে দেখেন।
·
হিন্দু মহাসভার বিরোধিতা: শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির
নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা অখণ্ড বাংলার ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং হিন্দুদের জন্য
পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ দাবি করেন।
·
মুসলিম লীগের একাংশের বিরোধিতা: মুসলিম লীগের খাজা
নাজিমউদ্দীন ও মাওলানা আকরাম খাঁর মতো প্রভাবশালী নেতারা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা
করে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন।
·
সাম্প্রদায়িক বিভাজন: ১৯৪৭ সালের অস্থির সাম্প্রদায়িক
পরিবেশ এবং হিন্দু-মুসলিম জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাংলা বিভাজনের পক্ষে প্রবল জনমত
থাকায় এই উদ্যোগ সফল হতে পারেনি।
এই প্রচেষ্টা সফল না
হলেও, বহু গবেষক মনে করেন, এটি ছিল বাঙালি জাতির
স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ প্রয়াসেরই একটি অংশ, যা
পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে।
13.
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্থানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিবরণ দাও ?
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল বাংলাদেশের
স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ। পাকিস্তান সরকার শুরু থেকেই পূর্ব
পাকিস্তানের প্রতি ঔপনিবেশিক শোষণমূলক নীতি গ্রহণ করে। এই নীতির ফলে পশ্চিম
পাকিস্তান দ্রুত সমৃদ্ধি লাভ করে, আর পূর্ব পাকিস্তান ক্রমাগত দরিদ্র হতে থাকে।
এই বৈষম্যের প্রধান ক্ষেত্রগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া
হলো:
১. আয় ও সম্পদ বন্টন
·
মাথাপিছু আয়: ১৯৪৭ সালে দুই অঞ্চলের মাথাপিছু আয় প্রায়
কাছাকাছি থাকলেও, অব্যাহত বৈষম্যের কারণে ১৯৭০ সালের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু
আয় পূর্ব পাকিস্তানের আয়ের প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
o
১৯৬৯-৭০ সালে: পশ্চিম পাকিস্তানে মাথাপিছু আয় ছিল ৫৩৭
রুপি, আর পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ৩৩১ রুপি।
·
জাতীয় সম্পদের বরাদ্দ: পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার (প্রায়
৫৬%) বেশিরভাগই পূর্ব পাকিস্তানে বাস করত, কিন্তু জাতীয় সম্পদের একটি বৃহৎ অংশ
(প্রায় ৭৫% পর্যন্ত) পশ্চিম পাকিস্তানে বরাদ্দ করা হতো।
·
উন্নয়ন ব্যয়: কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়ন বাজেটের
সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হতো।
o
১৯৫০-৫৫ সালে: পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের
উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র ২০%-এর মতো অংশ পেত।
o
১৯৬০-এর দশক: এই সময়েও পশ্চিম পাকিস্তানে বরাদ্দ ছিল ৬৪%
থেকে ৬৮%, আর পূর্ব পাকিস্তানে ৩২% থেকে ৩৬%।
২. বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও ব্যয়
·
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন: পূর্ব পাকিস্তান ছিল বৈদেশিক
মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস। মোট বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের ৬০% থেকে ৭০% আসত মূলত কাঁচা
পাট রপ্তানি থেকে।
·
ব্যয়ের অসমতা: পূর্ব পাকিস্তানের এই অর্জিত বৈদেশিক
মুদ্রার বেশিরভাগই ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন এবং পণ্য আমদানিতে। ফলে পূর্ব পাকিস্তান
তার নিজস্ব আয়ের তুলনায় খুবই কম অংশ পেত।
o
১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে পূর্ব পাকিস্তান মোট
আমদানির মাত্র ৩০% অংশ পেয়েছিল।
৩. রাজস্ব ও বাজেট বন্টন
·
রাজস্ব ব্যয়: কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্ব ও প্রশাসনিক
ব্যয়ের অধিকাংশ (সামরিক ও বেসামরিক খাত) পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত ছিল।
o
সামরিক ব্যয়: মোট সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৯০% পশ্চিম
পাকিস্তানে ব্যয় হতো। পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি ও নিয়োগ ছিল অপ্রতুল।
o
বেসামরিক ব্যয়: বেসামরিক খাতেও পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব
পাকিস্তানের চেয়ে বেশি বরাদ্দ পেত।
৪. শিল্প, কৃষি ও বিনিয়োগ
·
মূলধন বিনিয়োগ: মোট বেসরকারি বিনিয়োগের প্রায় ৭৭% পশ্চিম
পাকিস্তানে পরিচালিত হয়েছিল।
·
শিল্প উন্নয়ন: পাটকল, সুতাকল, চিনি
কল ইত্যাদি শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে বৈষম্য করা হয়। যদিও কাঁচামাল (যেমন পাট)
পূর্ব পাকিস্তানে উৎপাদিত হতো, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের
শিল্পপতিদেরকে কর অবকাশ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে শিল্পের বিকাশ ঘটানো হয়।
·
সামাজিক অবকাঠামো: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা
প্রতিষ্ঠান—প্রায় সব ক্ষেত্রেই
পশ্চিম পাকিস্তান অনেক এগিয়ে ছিল। গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রের (R&D) ১৬টির
মধ্যে ১৩টিরই অবস্থান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে।
এই অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে তীব্র
ক্ষোভ সৃষ্টি করে, যা ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি তৈরি
করেছিল।
14.
মুক্তিজুদ্ধে নারীর অবদান মুল্যায়ন করো ?
মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানকে কেবল একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে
সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়;
বরং তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ভিত্তি ও অনুপ্রেরণা। নারীরা সরাসরি যুদ্ধ
থেকে শুরু করে গেরিলা প্রশিক্ষণ, তথ্য আদান-প্রদান, এবং
যুদ্ধাহতদের সেবার মাধ্যমে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে নারীদের প্রধান অবদানগুলোকে নিম্নলিখিতভাবে মূল্যায়ন
করা যায়:
১. সরাসরি অংশগ্রহণ ও যুদ্ধ
নারীরা কেবল ঘরের কাজ সামলাননি, অনেকে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ
করেছেন।
·
গেরিলা যোদ্ধা: অনেক নারী গোপনে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং
গেরিলা অপারেশনে অংশ নিয়েছেন। এদের মধ্যে বিশেষ করে, সেতারা বেগম
(বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত) ও ক্যাপ্টেন সেতারা রহমান (বীর প্রতীক) উল্লেখযোগ্য।
·
গোয়েন্দা ও তথ্য সংগ্রাহক: অনেকে গোপনে পাকিস্তান
সেনাবাহিনীর ক্যাম্প থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্য সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের
কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
·
শিবিরের দায়িত্ব: কেউ কেউ সীমান্ত পেরিয়ে প্রশিক্ষণ
শিবিরে যোগ দিয়ে সামরিক প্রশিক্ষক, অস্ত্র বহনকারী বা বার্তাবাহক হিসেবে
কাজ করেছেন।
২. সেবা ও চিকিৎসায় ভূমিকা
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের সেবা দিয়ে নারীরা
যুদ্ধ জয়ের ভিত্তি মজবুত করেছেন।
·
সেবা ও চিকিৎসা: বহু নারী নিজ উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধা বা
যুদ্ধাহতদের জন্য সেবিকা বা নার্স হিসেবে কাজ করেছেন। ড. সেতারা বেগম (বীর প্রতীক)
ও ক্যাপ্টেন সেতারা রহমান (বীর প্রতীক) যুদ্ধক্ষেত্রে
চিকিৎসা সেবা দিয়ে বিরল সাহস দেখিয়েছেন।
·
শরণার্থী শিবিরে সেবা: ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে
নারীরা অসুস্থ ও ক্ষুধার্ত শরণার্থীদের সেবা, খাদ্য বিতরণ এবং মনোবল ধরে রাখতে
সহায়তা করেছেন।
৩. প্রেরণা, আশ্রয় ও রসদ সরবরাহ
মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ধরে রাখা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার
মাধ্যমে নারীরা পরোক্ষভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
·
আশ্রয় ও আহার: অগণিত নারী নিজের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের
গোপনে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন, তাদের খাদ্য ও প্রাথমিক চিকিৎসা
দিয়েছেন। অনেক সময় তাদের রান্না করা খাবারই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান রসদ।
·
মানসিক শক্তি: নারীরা তাদের স্বামী, পুত্র,
ভাই ও স্বজনদের যুদ্ধে যেতে উৎসাহিত করেছেন এবং কঠিন সময়ে তাদের
সাহস জুগিয়েছেন। তাদের এই ভূমিকা মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিক ও নৈতিক শক্তি জুগিয়েছে।
·
সম্পদ জোগান: অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ, গয়না ও
মূল্যবান সামগ্রী দিয়ে আর্থিক সহায়তা করেছেন।
গ বিভাগ প্রশ্ন উত্তর
1.
বাংলাদেশের জনগনের নৃতত্ত্বিক পরিচয় বিশ্লেষণ করো ?
বাংলাদেশের জনগণের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি
কোনো একক জাতিগোষ্ঠী নয়,
বরং বিভিন্ন সময়ে নানা জাতি ও মানবপ্রবাহের মিশ্রণে গড়ে ওঠা একটি
সংকর বা মিশ্র জাতিগোষ্ঠী। ভৌগোলিক অবস্থান ও ইতিহাসের কারণে এই অঞ্চলের জনগণের
মধ্যে কয়েকটি প্রধান নৃতাত্ত্বিক ধারার প্রভাব রয়েছে।
১. প্রধান নৃতাত্ত্বিক ধারা
বাংলাদেশের জনগণের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের প্রধান তিনটি ধারা নিচে
আলোচনা করা হলো:
ক. অস্ট্রো-এশীয় বা আদি-অস্ট্রালয়েড
এরা এই অঞ্চলের আদিমতম অধিবাসী বলে মনে করা হয়।
·
পরিচিতি: এদের বংশধররা মূলত সাঁওতাল, মুণ্ডা,
শবর ইত্যাদি আদিবাসী গোষ্ঠী।
·
প্রভাব: যদিও বাঙালি জনগোষ্ঠী পুরোপুরি এই ধারার না, তবুও এদের
দৈহিক গঠন ও ভাষার (বিশেষ করে প্রাচীন বাংলা ভাষার গঠনে) কিছুটা প্রভাব দেখা যায়।
খ. দ্রাবিড়
এরা সম্ভবত প্রাগৈতিহাসিক যুগে ভারত উপমহাদেশে আসে।
·
প্রভাব: ঐতিহাসিকদের মতে, এই দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী বাংলায়
আসে এবং অস্ট্রিকদের সাথে মিশে যায়। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এই গোষ্ঠীর বংশগত ও
ভাষাগত মিশ্রণও রয়েছে।
গ. মঙ্গোলীয় বা ভোট-চীনীয়
এরা প্রধানত বাংলাদেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (পার্বত্য
চট্টগ্রাম ও সিলেট) বসবাস করে।
·
পরিচিতি: এই ধারার অন্তর্ভুক্ত উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী হলো
চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো,
মণিপুরি ইত্যাদি।
·
প্রভাব: তাদের দৈহিক গঠনে মঙ্গোলীয় ছাপ স্পষ্ট (খাটো ও
চ্যাপ্টা নাক, ছোট চোখ, কম দাড়ি-গোঁফ)। এই জনগোষ্ঠীর সাথে
সমতল অঞ্চলের বাঙালিদের মিশ্রণও ঘটেছে।
২. আগত অন্যান্য মানবপ্রবাহের মিশ্রণ
প্রাচীনকালে এবং মধ্যযুগে বহু জাতিগোষ্ঠী ব্যবসা-বাণিজ্য ও শাসনের
সূত্রে বাংলায় এসেছে এবং স্থানীয়দের সাথে মিশে গেছে, যা
নৃতাত্ত্বিক পরিচয়কে আরও জটিল করেছে।
·
আর্য জাতি: আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে
ভারতীয় উপমহাদেশে আর্যদের আগমন ঘটে। এদের ভাষা ও সংস্কৃতি (ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা)
পরবর্তীতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মূল ভিত্তি তৈরি করে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের
ভাষায় এই ইন্দো-আর্য প্রভাব সর্বাধিক।
·
তুর্কো-ইরানীয়: মধ্যযুগে তুর্কি, আফগান, মোঘল ও পারস্য থেকে আসা মুসলমান শাসকরা
বাংলায় বসতি স্থাপন করেন। এরা শাসক ও ধর্ম প্রচারক হিসেবে আসে এবং স্থানীয়
জনগণের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
·
ইউরোপীয় জাতি: ইংরেজ, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ,
ফরাসি ইত্যাদি জাতিও বাংলায় দীর্ঘদিন বসবাস করেছে এবং স্থানীয়
জনগোষ্ঠীর সাথে মিশ্রিত হয়েছে, তবে এদের প্রভাব
অপেক্ষাকৃত কম।
৩. বর্তমান বাঙালি জাতিগোষ্ঠী
বর্তমানে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ 'বাঙালি' হিসেবে পরিচিত, যা মূলত আর্য-পূর্ব (অস্ট্রিক,
দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয়) এবং আর্য জাতির এক
জটিল মিশ্রণ।
·
সংকর জাতিসত্তা: এই মিশ্রণের ফলে বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর
মধ্যে কোনো একক বিশুদ্ধ জাতিসত্তা নেই। বাঙালিরা একটি সংকর
জাতিগোষ্ঠী, যার মধ্যে মঙ্গোলীয়, অস্ট্রিক ও আর্যদের
দৈহিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
·
বাঙালি জাতীয়তাবাদ: নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা সত্ত্বেও ভাষা
(বাংলা), সংস্কৃতি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের (বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন ও
মুক্তিযুদ্ধ) মাধ্যমে এই জনগণ এক ঐক্যবদ্ধ 'বাঙালি
জাতীয়তাবাদ'-এর জন্ম দিয়েছে।
সংক্ষেপে,
বাংলাদেশের জনগণ বহু জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির
মিশ্রণে গঠিত একটি সার্বজনীন বাঙালি জাতিসত্তা।
2.
উপনিবেশিক শাসন আমলে বাংলার সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা করো ?
উপনিবেশিক শাসনকালে বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ ছিল একটি
জটিল প্রক্রিয়া, যার প্রধান কারণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের 'ভাগ করো
ও শাসন করো' নীতি, অর্থনৈতিক
বৈষম্য এবং হিন্দু ও মুসলিম সমাজের মধ্যেকার আর্থ-সামাজিক পার্থক্য।
১. সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব: ব্রিটিশ
নীতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
ক. ব্রিটিশ 'ভাগ করো ও শাসন করো'
নীতি
·
পৃথক নির্বাচন নীতি (১৯০৯): ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের
জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করে, যা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে
রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টি করে। এটি সাম্প্রদায়িকতার উত্থানে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি
দেয়।
·
শিক্ষানীতি: ১৮৩৫ সালে ফারসি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজিকে সরকারি
ভাষা করার সিদ্ধান্ত মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশকে সরকারি চাকরি ও আধুনিক শিক্ষা
থেকে দূরে রাখে। পক্ষান্তরে হিন্দু উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি দ্রুত ইংরেজি শিক্ষা
গ্রহণ করে সরকারি চাকরি ও ব্যবসায় সুবিধা লাভ করে।
·
বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫): লর্ড কার্জনের বাংলাকে বিভক্ত করার
সিদ্ধান্তটি ছিল সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টির সবচেয়ে বড় উদাহরণ। যদিও এর
প্রশাসনিক কারণ দেখানো হয়েছিল, কিন্তু পূর্ববঙ্গে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং
পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল তৈরি হওয়ায় ধর্মীয় মেরুকরণ তীব্র হয়।
খ. আর্থ-সামাজিক বৈষম্য
·
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩): লর্ড কর্নওয়ালিসের
প্রবর্তিত এই ব্যবস্থায় জমির মালিকানা লাভ করে মূলত হিন্দু জমিদার শ্রেণি, যা তৎকালীন
অধিকাংশ মুসলিম কৃষক ও প্রজার উপর শোষণ বৃদ্ধি করে। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য
ধর্মীয় পরিচয়ের সাথে মিশে যায়।
·
শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা: উপরোক্ত কারণে মুসলিম সমাজ শিক্ষায়
পিছিয়ে পড়ে এবং সরকারি চাকরি ও পেশাগত ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিত্ব কমে যায়।
এতে তাদের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি জন্ম নেয়।
২. সাম্প্রদায়িকতার বিকাশ ও রাজনৈতিক রূপায়ণ
ক. মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক জাগরণ
·
মুসলিম লীগ গঠন (১৯০৬): মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার জন্য এই
রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। যদিও প্রথমে এর উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষাগত ও সামাজিক, কিন্তু ধীরে
ধীরে এটি মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে তুলে ধরে।
·
কৃষক-প্রজা আন্দোলন: বাংলার মুসলিম কৃষক ও প্রজারা হিন্দু
জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে, সেই আন্দোলনগুলি অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয়
চেহারা নেয়। ফজলুল হকের মতো নেতারা এই কৃষক-প্রজা আন্দোলনের মাধ্যমে দ্রুত
জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
খ. চরম হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান
·
হিন্দু মহাসভা: হিন্দু সমাজের কট্টরপন্থীরা মুসলিম লীগের
সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু জাতীয়তাবাদকে জোরদার করে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মতো নেতারা হিন্দু সমাজের স্বার্থ রক্ষার কথা তুলে ধরেন।
·
ধর্মীয় প্রতীক ও উৎসবের রাজনৈতিক ব্যবহার: কিছু চরমপন্থী
নেতা ও সংগঠন ধর্মীয় উৎসব ও প্রতীককে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিয়ে আসে, যা দুই
সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে তোলে।
গ. চরম পরিণতি: ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭
·
লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০): মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর 'দ্বিজাতি
তত্ত্বের' ভিত্তিতে মুসলিম লীগের এই প্রস্তাবে ভারতীয়
উপমহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের
(পরবর্তীকালে একটি রাষ্ট্র: পাকিস্তান) দাবি করা হয়। এটি
সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে চূড়ান্ত রাজনৈতিক রূপ দেয়।
·
১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা: নির্বাচনের পর বাংলা ভাগ নিয়ে
রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলে, 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের' সময় কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এই দাঙ্গায় বহু
নিরীহ মানুষ নিহত হয় এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
উপনিবেশিক শাসনের সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থ ও ব্রিটিশদের ইচ্ছাকৃত
বিভেদনীতির ফলে বাংলায় ধর্মীয় পরিচয় রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপান্তরিত হয়। এই নীতির
ফলেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থার অভাব সৃষ্টি হয়, যা শেষ
পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে বাংলাকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করার পথ প্রশস্ত করে।
3.
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দলনের গুরুত্ব বা তাৎপর্য আলোচনা করো ?
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী ঘটনা। এটি কেবল ভাষার অধিকার আদায়ের
আন্দোলন ছিল না, বরং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়সহ বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও
আত্মপরিচয় গঠনের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী।
১. বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা
·
স্বতন্ত্র জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা: ভাষা আন্দোলনের মধ্য
দিয়েই বাঙালিরা প্রথম বুঝতে পারে যে, ধর্মীয় পরিচয়ের (মুসলমান) ঊর্ধ্বে
তাদের একটি স্বতন্ত্র বাঙালি জাতিসত্তা বিদ্যমান, যা
সংস্কৃতি ও ভাষার ভিত্তিতে গঠিত। এটি ছিল সংকীর্ণ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ থেকে ধর্মনিরপেক্ষ
বাঙালি জাতীয়তাবাদের পথে প্রথম পদক্ষেপ।
·
ঐক্য ও সংহতি: এটি পূর্ব পাকিস্তানের সকল শ্রেণি-পেশার
মানুষকে, বিশেষ করে ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে এক অভূতপূর্ব ঐক্য ও সংহতির
বন্ধনে আবদ্ধ করে। এই সংহতিই পরবর্তী সকল রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল প্রেরণা হিসেবে
কাজ করেছে।
২. রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ও স্বাধিকার আন্দোলন
·
প্রথম রাজনৈতিক বিজয়: পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে
এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রথম সফল প্রতিরোধ ও বিজয়। এই সাফল্য বাঙালিদের
মধ্যে নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করার মতো আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।
·
গণতন্ত্রের দাবি: ভাষা আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করা। এটি প্রকারান্তরে গণতান্ত্রিক অধিকার ও
জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণাকে জোরদার করে।
·
স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা: ১৯৫২-এর পথ
ধরেই ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং অবশেষে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের
জন্ম হয়। ভাষা আন্দোলনকে তাই স্বাধীনতার প্রথম বীজ বপন হিসেবে গণ্য করা হয়।
৩. সাংস্কৃতিক জাগরণ ও মর্যাদা রক্ষা
·
সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা: এই আন্দোলন উর্দুকে
একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পশ্চিম পাকিস্তানি চক্রান্ত থেকে বাঙালি সংস্কৃতিকে
রক্ষা করে। এটি বাংলা ভাষা,
সাহিত্য ও রবীন্দ্র-নজরুল চর্চার পথকে উন্মুক্ত করে দেয়।
·
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষার্থে
ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে
'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে
ঘোষণা করেছে, যা বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে এক বিশেষ
মর্যাদা দিয়েছে।
৪. বৈষম্যবিরোধী
চেতনার জন্ম
·
শোষণের স্বরূপ উন্মোচন: ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করে যে, পশ্চিম
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কেবল রাজনৈতিকভাবেই নয়, সাংস্কৃতিক
ও অর্থনৈতিকভাবেও পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করতে চায়। এই আন্দোলন পশ্চিম
পাকিস্তানের উপনিবেশিক মনোভাবকে জনগণের সামনে উন্মোচিত করে দেয়।
সংক্ষেপে,
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির জন্য কেবল ভাষার অধিকার
আনেনি, বরং এটি ছিল জাতীয় চেতনার জন্ম, রাজনৈতিক আন্দোলনের সূতিকাগার এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল
অনুপ্রেরণা।
4.
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বাংলা ভাষার অবদান আলোচনা করো ?
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বাংলা ভাষার অবদান ছিল কেন্দ্রীয় ও
অপরিহার্য। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল
বাঙালি জনগণের জাতীয়তাবাদের ভিত্তি, রাজনৈতিক ঐক্যের
প্রতীক এবং চূড়ান্ত স্বাধীনতার মূল প্রেরণা। ভাষা আন্দোলনের মধ্য
দিয়ে যে চেতনার জন্ম হয়েছিল, তা-ই দীর্ঘ ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসন থেকে মুক্তি
অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
১. বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন
·
ধর্মের ঊর্ধ্বে পরিচয়: ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের
ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রথম
আঘাত আসে বাংলা ভাষার ওপর। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালিরা
অনুধাবন করে যে, ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ভাষা ও সংস্কৃতিই তাদের
মূল বন্ধন। এই উপলব্ধি সংকীর্ণ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ থেকে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি
জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়।
·
আত্মপরিচয়ের প্রতিষ্ঠা: "রাষ্ট্রভাষা বাংলা
চাই" এই স্লোগানটি ছিল নিজেদের অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রথম ঘোষণা।
ভাষার মাধ্যমেই বাঙালিরা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে, যা স্বাধীনতার চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করে তোলে।
২. রাজনৈতিক ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু
·
শোষণের স্বরূপ উন্মোচন: ভাষা আন্দোলন পশ্চিম পাকিস্তানের
শাসকগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক ও শোষণমূলক মানসিকতাকে জনগণের সামনে উন্মোচিত করে। বাঙালিরা
বুঝতে পারে যে, ভাষা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা ছিল সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শোষণেরই অংশ।
·
প্রথম সফল প্রতিরোধ: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিজয় ছিল
পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণের প্রথম বড় রাজনৈতিক সাফল্য। এই সাফল্য বাঙালিদের
মধ্যে নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রাম করার মতো আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনা
সৃষ্টি করে।
·
পরবর্তী আন্দোলনের বীজ: ভাষা আন্দোলনের ঐক্য ও সাফল্য পরবর্তী
সকল রাজনৈতিক আন্দোলন—যেমন ১৯৫৪ সালের
যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন,
১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের
ছয় দফা আন্দোলন, এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের—জন্য নৈতিক শক্তি ও আদর্শিক ভিত্তি জুগিয়েছিল। ছয় দফা
কর্মসূচির মাধ্যমে যে স্বাধিকারের দাবি উঠেছিল, তার মূলে ছিল ভাষাকেন্দ্রিক ঐক্য।
৩. সাংস্কৃতিক প্রেরণা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা
·
সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য: বাংলা ভাষা কেবল সাহিত্য, গান, কবিতা ও লোকজ ঐতিহ্যের ধারক ছিল না, এটি ছিল
বাঙালি সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতিসহ
বাঙালি সংস্কৃতি চর্চাকে পশ্চিম পাকিস্তানের চাপ থেকে রক্ষা করার মাধ্যমেই সাংস্কৃতিক
মুক্তি ও জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটে।
·
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: ভাষা আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগ
পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এক অদম্য প্রেরণার প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে। এই আত্মত্যাগ
মানুষকে শিখিয়েছে যে,
ন্যায়সঙ্গত দাবির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও বাঙালি
প্রস্তুত।
·
যুদ্ধের স্লোগান: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে 'জয় বাংলা'
স্লোগানটি ছিল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসার এবং এর মর্যাদা
প্রতিষ্ঠারই এক মূর্ত প্রকাশ। এটি কেবল একটি যুদ্ধকালীন স্লোগান ছিল না, এটি ছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূলমন্ত্র।
সুতরাং,
বাংলা ভাষা কেবল একটি ভাষা ছিল না; এটি
ছিল একটি আদর্শ, একটি ঐক্যসূত্র এবং একটি প্রেরণা,
যা বাঙালি জাতিকে সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও
ঐক্যের পথে পরিচালিত করে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। বাংলা ভাষার মর্যাদা
রক্ষার জন্য জীবন দেওয়ার এই নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
5.
পাকিস্থানের দুই অংশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের ধারনা দাও ?
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর দুই অংশ—পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তানের
(বর্তমান পাকিস্তান) মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে। এই
বৈষম্যই বাঙালি জাতীয়তাবাদকে তীব্র করে তোলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ
প্রশস্ত করে।
১. রাজনৈতিক বৈষম্য
রাজনৈতিক ক্ষমতা, শাসন এবং জনপ্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে পূর্ব
পাকিস্তানকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিল।
ক. কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ও প্রতিনিধিত্বের অভাব
·
সংখ্যাগরিষ্ঠের বঞ্চনা: পূর্ব পাকিস্তানে ছিল পাকিস্তানের
মোট জনসংখ্যার (প্রায় ৫৬%) সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। কিন্তু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা, সরকারি
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং আইন প্রণয়নে পশ্চিম পাকিস্তানি আমলা ও সামরিক
চক্রের প্রভাব ছিল একচ্ছত্র।
·
রাজনৈতিক নেতৃত্ব: পাকিস্তানের গভর্নর-জেনারেল, প্রধানমন্ত্রী
বা প্রেসিডেন্ট পদগুলোতে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা, বিশেষ
করে পাঞ্জাবি নেতারা, প্রাধান্য বিস্তার করতেন। পূর্ব
পাকিস্তানের নেতারা নামমাত্র পদে থাকলেও তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল
সীমিত।
·
শাসন কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ: কেন্দ্রীয় সচিবালয় এবং সকল
প্রধান সরকারি দপ্তর পশ্চিম পাকিস্তানের (প্রথমে করাচি, পরে
ইসলামাবাদ) স্থাপন করা হয়। এই দপ্তরগুলোতে পূর্ব পাকিস্তানের
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য। উদাহরণস্বরূপ, কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদে বাঙালিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫-৭ শতাংশ।
খ. গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ ও আঞ্চলিক
স্বায়ত্তশাসনের অভাব
·
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধা: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন
থেকে শুরু করে সামরিক শাসন জারি হওয়া পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের
গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে বারবার দমন করা হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের
ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা দিতে বারবার টালবাহানা করা হয়।
·
আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনকে অস্বীকার: বাঙালিরা ছয় দফা
কর্মসূচির মাধ্যমে যে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছিল, পশ্চিম
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করে এবং
কঠোরভাবে দমন করে। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা করে কোনো কার্যকর আইন প্রণয়ন বা
অর্থ ব্যয়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
২. সামাজিক বৈষম্য
শিক্ষা,
স্বাস্থ্য, সামরিক ও সরকারি চাকরিসহ
সামাজিক অবকাঠামো খাতে পূর্ব পাকিস্তানকে পরিকল্পিতভাবে পিছিয়ে রাখা হয়েছিল।
ক. শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বৈষম্য
·
শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ: শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের
সিংহভাগ যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
স্থাপন, আধুনিকায়ন ও গবেষণা প্রায় বন্ধ ছিল।
o
উদাহরণস্বরূপ, ভারত ভাগের পর ২৫ বছরে পূর্ব
পাকিস্তানে টাকার অভাবে শত শত স্কুল বন্ধ হয়ে যায়, যেখানে
পশ্চিম পাকিস্তানে স্কুলের সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে গিয়েছিল।
·
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন: উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার
প্রচেষ্টা ছিল বাঙালি সংস্কৃতির উপর প্রথম আঘাত। পরে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ
করা এবং বাংলা ভাষা ও বর্ণমালাকে পরিবর্তনের উদ্যোগ বাঙালি সমাজে তীব্র ক্ষোভ
সৃষ্টি করে।
খ. সামরিক ও সরকারি চাকরিতে অসমতা
·
সামরিক বাহিনীতে প্রতিনিধিত্ব: সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের
প্রতিনিধিত্ব ছিল একেবারেই নগণ্য। উচ্চ ও মধ্যম পর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তাদের
মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ ছিল বাঙালি। সামরিক বাজেটের প্রায় ৯৫% পশ্চিম পাকিস্তানে
ব্যয় করা হতো।
·
বেসামরিক ও উচ্চ সরকারি চাকরি: পিএসসি ও অন্যান্য সরকারি
সংস্থার মাধ্যমে উচ্চ ও মধ্যম স্তরের বেসামরিক প্রশাসনে পশ্চিম পাকিস্তানি বিশেষ
করে পাঞ্জাবিদের প্রাধান্য ছিল। ফলে বাঙালিরা যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বহু ক্ষেত্রে
চাকরি পেতে বঞ্চিত হতো।
গ. স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো
·
স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার (রাস্তা, রেল, বিমানবন্দর) উন্নয়নেও পশ্চিম পাকিস্তানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পূর্ব পাকিস্তানের ঘনবসতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও জনস্বাস্থ্য
ও অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল অপ্রতুল।
উপসংহারে বলা যায়, সামাজিক ও রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই পূর্ব
পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের একটি অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ। এই বৈষম্য কেবল
অর্থনৈতিক শোষণের মাধ্যমেই শেষ হয়নি, বরং তা ছিল বাঙালি জাতিসত্তা ও
গণতন্ত্রের উপর এক ধারাবাহিক আঘাত। এর ফলে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক অসন্তোষই শেষ
পর্যন্ত স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপ নেয়।
6.
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দলনের পটভূমি ও ঘটনা প্রবাহের বিবরণ দাও ?
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির জাতিসত্তা ও আত্মমর্যাদা রক্ষার
এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। এর পটভূমি তৈরি হয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই, এবং ১৯৫২
সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনাপ্রবাহ ছিল চূড়ান্ত বিস্ফোরণ।
১. পটভূমি (Background)
ক. দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
(১৯৪৭)
১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তখন এর মূল
ভিত্তি ছিল দ্বিজাতিতত্ত্ব (হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক
জাতি)। বাঙালি মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কারণে
পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে (পূর্ব বাংলা) একটি
উপনিবেশ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে।
খ. ভাষার প্রশ্ন উত্থাপন
·
প্রথম আক্রমণ: স্বাধীনতার আগেই ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর
মতো বুদ্ধিজীবীরা বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবি জানান। কিন্তু ১৯৪৭ সালেই
পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে।
·
ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের প্রস্তাব (১৯৪৮): ১৯৪৮ সালের ২৩
ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে পূর্ব বাংলার কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ
দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার এবং সরকারি কাজে ব্যবহার করার দাবি জানান। পশ্চিম
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী,
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, এই প্রস্তাবকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
·
জিন্নাহর ঘোষণা (১৯৪৮): ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকা
রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, "উর্দুই
হবে এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।" এই ঘোষণার সঙ্গে
সঙ্গেই ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
গ. রাজনৈতিক সংগঠন ও সংগ্রাম পরিষদ গঠন
·
জিন্নাহর ঘোষণার পর বাঙালি ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মহলে
ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ১৯৫২ সালের গোড়ার দিকে আবুল হাশিম, অধ্যাপক আবুল
কাসেম প্রমুখের নেতৃত্বে গঠিত হয় তমুদ্দুন মজলিস এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলোর
সমন্বয়ে গঠিত হয় সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।
২. ঘটনাপ্রবাহ
ক. রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ও কর্মসূচি গ্রহণ
·
১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি: পাকিস্তানের তৎকালীন
প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ঢাকায় ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের
একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তানে
পুনরায় তীব্র আন্দোলন শুরু হয়।
·
৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২: ছাত্ররা ঢাকায় পূর্ণ ধর্মঘট
পালন করে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে সাধারণ ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি
ঘোষণা করা হয়।
খ. চূড়ান্ত বিস্ফোরণ: ২১ ফেব্রুয়ারি (১৯৫২)
·
২০ ফেব্রুয়ারি: আন্দোলন দমনের জন্য তৎকালীন প্রাদেশিক
সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সকল প্রকার সমাবেশ, মিছিল ও
সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে।
·
২১ ফেব্রুয়ারি: ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও ছাত্ররা এই
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাস্তায় নামে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়
(বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ সংলগ্ন) সমবেত হয়।
·
পুলিশের গুলিবর্ষণ: ছাত্ররা মিছিল নিয়ে এগিয়ে যেতে
চাইলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে
পুলিশ নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে।
·
শহীদ: পুলিশের গুলিতে আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন
আহমদ, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম
ও শফিউর রহমান সহ আরো অনেকে শহীদ হন। এই হত্যাকাণ্ড ভাষা আন্দোলনকে এক নতুন মাত্রা
দেয়।
গ. ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারির প্রতিক্রিয়া
·
২২ ফেব্রুয়ারি: ছাত্রদের মিছিলে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে
ঢাকা শহরে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এই দিন আরও অনেকে পুলিশের
গুলিতে শহীদ হন।
·
শহীদ মিনার নির্মাণ: ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ছাত্ররা ঢাকা
মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের প্রাঙ্গণে পুলিশের গুলিতে নিহতদের স্মরণে তাৎক্ষণিকভাবে
একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে। এটি ছিল বাঙালি জাতির প্রতিরোধের প্রথম প্রতীকী
মিনার, যা পরে পাকিস্তানি পুলিশ ভেঙে দেয়।
ঘ. ফলাফল
·
কেন্দ্রীয় সরকারের নতি স্বীকার: দেশব্যাপী তীব্র
গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে
এবং বাংলায় সরকার গঠন করে।
·
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: অবশেষে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের
সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় জীবনে এক মাইলফলক। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই
বাঙালিরা তাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার পথ খুঁজে পায়। এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের
বীজ বপন করে এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে
কাজ করে।
7.
১৯৫৪ সালের নির্বাচনের যুক্তফ্রন্ট বিজয়ের কারন সমুহ আলোচনা করো ?
১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট তৎকালীন
ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে এক ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেছিল।
এই বিজয়ের পেছনে বেশ কিছু শক্তিশালী কারণ কাজ করেছিল, যার মূল
ভিত্তি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক নীতির বিরুদ্ধে
পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।
১. প্রধান কারণ: ভাষা
আন্দোলন ও মুসলিম লীগের ব্যর্থতা
·
ভাষা আন্দোলনের প্রভাব: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বর্বরতা বাঙালি জনগণের মধ্যে তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম
দেয়। যুক্তফ্রন্ট এই চেতনার সঠিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়। এটি
মুসলিম লীগকে বাঙালিবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে।
·
মুসলিম লীগের জনবিচ্ছিন্নতা: মুসলিম লীগ ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৪
সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকলেও তারা জনগণের মৌলিক দাবি, বিশেষ করে বাংলা
ভাষার মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে ব্যর্থ হয়। উপরন্তু, দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দুর্নীতি জনগণের আস্থা নষ্ট করে।
২. নির্বাচনী কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতি
·
যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি: যুক্তফ্রন্ট তাদের
নির্বাচনী ইশতেহারে ঐতিহাসিক ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে, যা ছিল
বাঙালি জনগণের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। এই কর্মসূচির মূল বিষয়গুলো ছিল
অত্যন্ত জনমুখী:
o
বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা।
o
জমিদারি প্রথা বিলোপ করা ও কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা।
o
পাট ব্যবসাকে জাতীয়করণ করা (যা ছিল পূর্ব
পাকিস্তানের প্রধান অর্থকরী ফসল)।
o
স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক
বৈষম্য দূর করা।
o
রাজবন্দীদের মুক্তি দেওয়া।
·
এই ২১ দফা কর্মসূচি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিপুল সাড়া
ফেলে এবং তারা যুক্তফ্রন্টকে মুক্তির প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে।
৩. যোগ্য নেতৃত্ব ও দলীয় ঐক্য
·
ঐক্যবদ্ধ জোট গঠন: যুক্তফ্রন্ট ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার
চারটি প্রধান বিরোধী দল—আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরে আওয়ামী
লীগ), কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে
ইসলাম এবং গণতন্ত্রী দল-এর একটি শক্তিশালী জোট। এই
ঐক্যবদ্ধতা জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করে।
·
জনপ্রিয় নেতৃত্ব: এই জোটে ছিলেন তৎকালীন বাংলার অত্যন্ত জনপ্রিয়
ও প্রভাবশালী নেতা যেমন—শেরে বাংলা এ. কে.
ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এবং তরুণ নেতা শেখ
মুজিবুর রহমান। এই ক্যারিশম্যাটিক ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব নির্বাচনের
মাঠে মুসলিম লীগের দুর্বল নেতৃত্বকে সহজেই পরাস্ত করে।
৪. অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রভাব
·
শোষণ ও বঞ্চনা: পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা
পূর্ব পাকিস্তানের উপর চালানো অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্য ছিল তীব্র। শিল্প, শিক্ষা,
সরকারি চাকরি ও উন্নয়ন খাতে পূর্ব পাকিস্তানকে পরিকল্পিতভাবে
বঞ্চিত করা হচ্ছিল।
·
কৃষক ও শ্রমিকদের সমর্থন: যুক্তফ্রন্ট তাদের কর্মসূচিতে
জমিদার প্রথা বিলোপ এবং পাটের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় কৃষক
ও শ্রমিক শ্রেণি ব্যাপকভাবে তাদের সমর্থন করে।
উপসংহারে বলা যায়, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ছিল মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম
পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক নীতির মধ্যেকার লড়াই। যুক্তফ্রন্টের বিজয় ছিল
বাঙালি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতির
মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এটিই ছিল
পাকিস্তানের রাজনীতিতে বাঙালির প্রথম বড় আঘাত এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে
প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
8.
১৯৫৬ সালের পাকিস্থানের সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলো ব্যাখ্যা করো ?
১৯৫৬ সালের সংবিধান ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধান, যা দীর্ঘ নয়
বছর পর (২৩ মার্চ, ১৯৫৬) কার্যকর হয়েছিল। এটি ছিল মূলত
একটি সমঝোতার দলিল, যেখানে ইসলাম, গণতন্ত্র ও ফেডারেল কাঠামোর মিশ্রণ ঘটানো হয়েছিল।
১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল নিম্নরূপ:
১. রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও ধর্মীয় বিধান
·
ইসলামী প্রজাতন্ত্র: সংবিধান অনুযায়ী পাকিস্তানের সরকারি
নাম হয় 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান'।
·
ইসলামী আইন: সংবিধানে বলা হয় যে, পবিত্র কুরআন
ও সুন্নাহর পরিপন্থী কোনো আইন প্রণয়ন করা যাবে না। রাষ্ট্রপ্রধানকে অবশ্যই
মুসলমান হতে হবে।
·
উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাবনা: ১৯৪৯ সালে গৃহীত এই
প্রস্তাবনাকে সংবিধানের প্রস্তাবনা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেখানে ইসলামী নীতি, গণতন্ত্র ও সামাজিক
ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছিল।
২. শাসনব্যবস্থা ও আইনসভা
·
লিখিত সংবিধান: এটি ছিল একটি লিখিত ও সুদীর্ঘ সংবিধান।
এতে ২৩৪টি অনুচ্ছেদ, ১৩টি অংশ এবং ৬টি তফসিল ছিল।
·
যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার: সংবিধানে দেশে যুক্তরাষ্ট্রীয়
সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এতে কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করা হয়
(যুক্তরাষ্ট্রীয় তালিকা, প্রাদেশিক তালিকা ও যুগ্ম
তালিকা)।
·
এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা: কেন্দ্রে এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা
(জাতীয় পরিষদ) গঠনের বিধান রাখা হয়।
·
সমতার নীতি: আইনসভায় দুই অঞ্চলের মধ্যে সমতার
নীতি চালু করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয়কেই ১৫০টি করে মোট
৩০০টি আসন দেওয়া হয়।
৩. সরকার পদ্ধতি ও রাষ্ট্রভাষা
·
সংসদীয় সরকার: এ সংবিধানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন
করা হয়। রাষ্ট্রপতি (প্রেসিডেন্ট) হন রাষ্ট্রের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হন
সরকারের প্রধান । প্রধানমন্ত্রীকে জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ
সদস্যের আস্থাভাজন হতে হতো।
·
রাষ্ট্রভাষা: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ফলস্বরূপ
সংবিধানে বাংলা ও উর্দু-কে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে
স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
৪. অন্যান্য বিধান
·
মৌলিক অধিকার: সংবিধানে নাগরিকদের জন্য মৌলিক
অধিকারসমূহ সন্নিবেশিত করা হয় এবং এই অধিকারগুলো আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য ছিল।
·
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
নিশ্চিত করা হয়েছিল এবং সুপ্রিম কোর্টকে সংবিধানের ব্যাখ্যা ও অভিভাবকত্ব করার
দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
·
সার্বজনীন ভোটাধিকার: জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল
প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচনের
ব্যবস্থা করা হয়।
এই সংবিধানটি ছিল পাকিস্তানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সংবিধান, কিন্তু
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের কারণে এটি মাত্র আড়াই
বছর কার্যকর থাকার পর ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক আইন জারির মাধ্যমে বাতিল করা
হয়।
9.
১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল ও গুরুত্ব বিশ্লেষণ করো ?
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম এবং
একমাত্র নির্বাচন যা সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়।
এই নির্বাচনের ফলাফল ছিল অভূতপূর্ব, যা পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামোর
দুর্বলতা উন্মোচন করে এবং সরাসরি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ প্রশস্ত করে।
নির্বাচনের
ফলাফল
এই নির্বাচন জাতীয় পরিষদ (কেন্দ্রীয় আইনসভা) এবং প্রাদেশিক পরিষদ—উভয় স্তরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ক. জাতীয় পরিষদের ফলাফল
জাতীয় পরিষদে মোট আসন ছিল ৩১৩টি (৩০০টি সাধারণ ও ১৩টি সংরক্ষিত মহিলা
আসন)।
|
দল |
মোট আসন সংখ্যা (সংরক্ষিতসহ) |
পূর্ব পাকিস্তানে প্রাপ্ত আসন |
পশ্চিম পাকিস্তানে প্রাপ্ত আসন |
|
আওয়ামী লীগ (AL) |
১৬৭ (মোট আসনের
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা) |
১৬৭ (সাধারণ ১৬০/১৬২; সংরক্ষিত ৭/৭) |
০ |
|
পাকিস্তান পিপলস পার্টি (PPP) |
৮৬ |
০ |
৮৬ (সাধারণ ৮১/১৩৮; সংরক্ষিত ৫/৬) |
|
অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র |
৬০ |
২ |
৫৮ |
·
আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা: বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬৯টি আসনের মধ্যে
১৬৭টিতে জয়লাভ করে। এই বিজয়ের মাধ্যমে দলটি কেন্দ্রীয় আইনসভায় একক
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
·
ভূট্টোর আঞ্চলিক বিজয়: জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন
পাকিস্তান পিপলস পার্টি (PPP)
প্রধানত পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে ৮৬টি আসন
পেয়ে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়। দলটি পূর্ব পাকিস্তানে কোনো প্রার্থী দেয়নি।
খ. প্রাদেশিক পরিষদের ফলাফল
পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে মোট আসন ছিল ৩১০টি। এর মধ্যে আওয়ামী
লীগ ২৯৮টি আসনে জয়লাভ করে।
নির্বাচনের
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এর
গুরুত্ব ছিল সুদূরপ্রসারী:
১. ছয় দফার প্রতি গণরায় (Mass Mandate
for Six Points)
আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ছয় দফা কর্মসূচিকে মূল
বিষয়বস্তু করেছিল। তাদের এই ভূমিধ্বস বিজয় প্রমাণ করে যে, পূর্ব
পাকিস্তানের জনগণ পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং সকল প্রকার বৈষম্যের অবসান
চেয়েছিল। এটি ছিল ছয় দফার প্রতি জনগণের ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট।
২. বাঙালি জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত বিজয়
এই নির্বাচনের মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের রাজনীতি
চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ প্রমাণ করে যে তাদের প্রধান
পরিচয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ,
যা ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গঠিত। এই নির্বাচন ছিল বাঙালি
জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বৈধতা।
৩. পাকিস্তানের বিভাজন প্রকাশ
নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হয় যে, পাকিস্তান রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। আওয়ামী লীগ পূর্ব
পাকিস্তানে একক নেতা এবং PPP
পশ্চিম পাকিস্তানে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। দুই অংশের
মধ্যে কোনো রাজনৈতিক মিল বা সর্বজনীন দলীয় কাঠামো ছিল না।
৪. ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি ও স্বাধীনতার পথে
যাত্রা
কেন্দ্রীয় আইনসভায় আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হলেও, প্রেসিডেন্ট
ইয়াহিয়া খান এবং PPP প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ
মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানান।
·
নির্বাচনী ফলাফলকে অস্বীকার করে ইয়াহিয়া খানের জাতীয়
পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার (১ মার্চ, ১৯৭১) ঘোষণাই ছিল বাঙালির জন্য
চূড়ান্ত আঘাত।
·
এই অস্বীকৃতির ফলে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু
হয় এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সুতরাং,
১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথে শেষ
গণতান্ত্রিক ধাপ। এটিই ছিল বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে স্বাধীনতার পক্ষে
দেওয়া গণতান্ত্রিক রায়,
যা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতির
কারণে সশস্ত্র সংগ্রামে পর্যবসিত হয়েছিল।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারন ও ফলাফল বিশ্লেষণ কর?
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বাঙালি
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন ও শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার
জন্য দায়ের করা একটি মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। এটি বাঙালি জাতির মুক্তির
সংগ্রামকে আরও তীব্র করে তুলেছিল।
১. মামলার কারণ
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করার প্রধান কারণগুলো ছিল নিম্নরূপ:
ক. ছয় দফা কর্মসূচির জনপ্রিয়তা
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে ছয়
দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ
করে। আইয়ুব খানের সামরিক সরকার বুঝতে পারে যে, ছয় দফাকে কেন্দ্র করে বাঙালি
জাতীয়তাবাদ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা পাকিস্তানের অখণ্ডতার জন্য হুমকি। এই
আন্দোলনকে দমন করাই ছিল প্রধান কারণ।
খ. শেখ মুজিবুর রহমানকে অপসারণের চক্রান্ত
পাকিস্তান সরকার চেয়েছিল ছয় দফার মূল নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহী
হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে। মামলাটি ছিল মূলত তাঁকে এবং
আওয়ামী লীগকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে প্রমাণ করার একটি কৌশল।
গ. সামরিক বাহিনীতে প্রভাবের ভয়
মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের সহায়তায়
পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিয়ে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘটিয়ে
পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্র করছিলেন। এই অভিযোগের মাধ্যমে সামরিক
বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা এবং তাদের মধ্যে থাকা জাতীয়তাবাদী
চেতনাকে দমন করার চেষ্টা করা হয়।
২. মামলার ফলাফল
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ফলাফল পাকিস্তান সরকারের জন্য ছিল সম্পূর্ণ
বিপরীত। এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছিল।
ক. গণঅভ্যুত্থান
মামলার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান রাতারাতি জাতীয় বীর এবং বাঙালির
অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর মুক্তির দাবিতে ১৯৬৮ সালের শেষ দিক
থেকে ১৯৬৯ সালের শুরু পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়। এই গণআন্দোলনের মুখে
আইয়ুব খানের পতন ঘটে।
খ. মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তি
জনগণের তীব্র আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার
করতে বাধ্য হয়।
·
১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব সরকার মামলাটি
প্রত্যাহার করে নেয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল অভিযুক্তকে মুক্তি
দেয়।
·
এই বিজয়ের পরদিন, ২৩ ফেব্রুয়ারি, এক জনসভায় শেখ মুজিবকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
গ. স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উত্তরণ
এই মামলার ফলস্বরূপ বাঙালির আন্দোলন স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে
স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তরিত হয়। মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার কারণে বাঙালিরা
নিশ্চিত হয় যে, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধান দেবে
না।
·
বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ আরও দৃঢ়ভাবে ছয় দফার
ভিত্তিতে রাজনীতি চালিয়ে যেতে থাকে, যা ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের
মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি করে।
উপসংহারে বলা যায়, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি ছিল আইয়ুব খানের সামরিক
সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এটি আইয়ুব খানের পতন ঘটায়, বঙ্গবন্ধুকে
জাতীয় বীরের মর্যাদায় উন্নীত করে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মকে অনিবার্য করে
তোলে।
11.
১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলন বর্ণনা করো ?
১৯৭১ সালের মার্চ মাসের অসহযোগ আন্দোলন ছিল মূলত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে পরিচালিত একটি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ, যা কার্যত পূর্ব
পাকিস্তানকে পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং সশস্ত্র
মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ঘটায়। এটি ছিল বেসামরিক জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে
স্বাধীনতা অর্জনের পথে বাঙালির চূড়ান্ত প্রস্তুতি।
পটভূমি
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
অর্জন করলেও, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী (প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং
পাকিস্তান পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা
হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়।
·
১ মার্চ, ১৯৭১: প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের
অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।
·
এই ঘোষণায় ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিক্ষোভে ফেটে
পড়ে।
অসহযোগ
আন্দোলনের সূচনা ও বিস্তার
২ মার্চ: আন্দোলনের শুরু
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারাদেশে হরতাল
পালনের আহ্বান জানান। এই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ
বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করে।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ
৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু
এক বিশাল জনসভায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি:
·
অসহযোগ আন্দোলনের বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
·
চারটি শর্ত দেন (সামরিক আইন প্রত্যাহার, সেনাবাহিনীকে
ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, গণহত্যার তদন্ত ও নির্বাচিত
প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর)।
·
চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতার ইঙ্গিত দেন, "এবারের
সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম
স্বাধীনতার সংগ্রাম।"
৮ থেকে ২৫ মার্চ: বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা
৭ মার্চের ভাষণের পর পূর্ব পাকিস্তান কার্যত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই
পরিচালিত হতে থাকে। অসহযোগ আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল:
·
সরকারি প্রতিষ্ঠান বয়কট: সকল সরকারি, আধা-সরকারি
অফিস, সচিবালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,
ব্যাংক, এবং কোর্ট-কাচারি বন্ধ হয়ে
যায়।
·
কর ও খাজনা বন্ধ: জনগণ পাকিস্তান সরকারকে সকল প্রকার কর ও
খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয়।
·
আওয়ামী লীগের নির্দেশনা: সকল প্রশাসনিক কাজ (যেমন অফিস
খোলা, ব্যাংক লেনদেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ) আওয়ামী
লীগের নির্দেশনায় পরিচালিত হতে থাকে।
·
মিডিয়া ও যোগাযোগ: বাঙালি কর্মকর্তারা বেতার ও টেলিভিশনে
বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য প্রচারের ব্যবস্থা করেন। সকল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ
আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
·
স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ: কৃষক, শ্রমিক,
ছাত্র, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, ডাক্তার, শিল্পী—সকল শ্রেণি-পেশার
মানুষ এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়।
গুরুত্ব ও
পরিণতি
মার্চের অসহযোগ আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীনতার পথে
চূড়ান্ত প্রস্তুতির পর্ব।
1. বেসামরিক শাসন
প্রতিষ্ঠা: এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক শাসন সম্পূর্ণভাবে বঙ্গবন্ধুর
অধীনে চলে আসে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এখানে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
2. জনগণের ম্যান্ডেট: এটি
প্রমাণ করে যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ শুধুমাত্র স্বায়ত্তশাসন নয়, বরং স্বাধীনতার
জন্য প্রস্তুত এবং একজন নেতার (বঙ্গবন্ধু) নির্দেশে ঐক্যবদ্ধ।
3. সশস্ত্র সংগ্রামের
সূচনা: এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে অসহনীয় হয়ে
ওঠে। এর প্রতিক্রিয়ায়ই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ 'অপারেশন
সার্চলাইট' নামে গণহত্যা শুরু করে, যা সরাসরি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণ হয়।
অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ
ত্যাগ স্বীকারের মানসিক প্রস্তুতি লাভ করে এবং কার্যত স্বাধীনতা ঘোষণা করার
পূর্বেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির কারন ও পটভূমি বর্ণনা করো ?
১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তি, যা ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি
স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেয়, তার মূল কারণ ছিল দীর্ঘদিনের
সাম্প্রদায়িক বিভেদ, ব্রিটিশের 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতি, এবং মুসলিম লীগের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি (দ্বিজাতিতত্ত্ব)।
১. পটভূমি
ভারত বিভক্তির পটভূমি তৈরি হয়েছিল বহু দশক ধরে, যার মূল
স্তম্ভ ছিল হিন্দু ও মুসলিম সমাজের মধ্যেকার ক্রমবর্ধমান দূরত্ব।
ক. সাম্প্রদায়িক বিভেদের সূচনা
·
ঐতিহাসিক দূরত্ব: ভারতে মুসলিম শাসন, বিশেষ করে
মুঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং ব্রিটিশ শাসনের উত্থানের পর, দুই
সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও পারস্পরিক আস্থায় চিড় ধরে।
·
স্যার সৈয়দ আহমদ খান ও মুসলিম রাজনীতি: ১৮৫৭ সালের
সিপাহী বিদ্রোহের পর স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলমানদের জন্য আধুনিক শিক্ষার
প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং কংগ্রেসের রাজনীতি থেকে মুসলমানদের দূরে থাকার আহ্বান
জানান। তাঁর বক্তব্য মুসলমানদের মধ্যে পৃথক রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয়।
খ. রাজনৈতিক সংঘাতের বিকাশ
·
মুসলিম লীগ গঠন (১৯০৬): ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ গঠিত
হয়, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও
স্বার্থ রক্ষা করা। এটি কংগ্রেসের সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী ধারণা থেকে মুসলমানদের
আলাদা করে দেয়।
·
পৃথক নির্বাচন নীতি (১৯০৯): ব্রিটিশ সরকার ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো
সংস্কার আইনে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করে। এই নীতি ধর্মীয়
পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিভেদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং 'ভাগ করো ও
শাসন করো' নীতিকে কার্যকর করে।
·
বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫): লর্ড কার্জনের বাংলাকে বিভক্ত করার
সিদ্ধান্ত (যদিও পরে রদ হয়) সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে তীব্র করে। এটি মুসলিম
সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ ও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ তৈরি করে সাম্প্রদায়িক
রাজনীতির বীজ বপন করে।
২. ভারত বিভক্তির প্রধান কারণ
ক. দ্বিজাতিতত্ত্ব
·
ধারণা: ভারত বিভক্তির মূল দার্শনিক ভিত্তি ছিল দ্বিজাতিতত্ত্ব। মুসলিম লীগের নেতা মুহাম্মদ
আলী জিন্নাহ যুক্তি দেন যে হিন্দু ও মুসলমান দুটি ভিন্ন জাতি এবং তাদের ভাষা, সংস্কৃতি,
ধর্ম ও জীবনধারা সম্পূর্ণ আলাদা।
·
দাবি: জিন্নাহর মতে, যেহেতু এই দুই জাতি এক রাষ্ট্রে
শান্তিতে সহাবস্থান করতে পারবে না, তাই মুসলমানদের জন্য
একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রয়োজন।
খ. লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০)
·
১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম
সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র (পরবর্তীকালে
এটিকে 'পাকিস্তান' নামে একটি
রাষ্ট্রের দাবি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়) গঠনের দাবি জানায়। এটি ছিল বিভক্তির
চূড়ান্ত রাজনৈতিক ঘোষণা।
গ. ব্রিটিশের 'ভাগ করো ও শাসন করো'
নীতি
ব্রিটিশ সরকার তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার জন্য এই নীতি
অত্যন্ত সফলভাবে প্রয়োগ করে। তারা এমন আইন ও সংস্কার প্রবর্তন করে যা দুই
সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস ও শত্রুতা বাড়ায়, যার ফলে ভারত একতাবদ্ধ থাকতে ব্যর্থ
হয়।
ঘ. রাজনৈতিক অচলাবস্থা
·
ক্যাবিনেট মিশন ব্যর্থতা (১৯৪৬): ব্রিটিশ সরকার একটি
ঐক্যবদ্ধ ভারত রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে ক্যাবিনেট মিশন পাঠালেও কংগ্রেস ও মুসলিম
লীগের আপসহীন মনোভাবের কারণে তা ব্যর্থ হয়।
·
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা: ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগের 'প্রত্যক্ষ
সংগ্রাম দিবস' ঘোষণার পর কলকাতা ও অন্যান্য স্থানে ভয়াবহ
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এই ব্যাপক সহিংসতা প্রমাণ করে যে ঐক্যবদ্ধ ভারত
সম্ভব নয় এবং দ্রুত বিভক্তি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
ঙ. মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা (১৯৪৭)
উপসংহারে,
ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন বুঝতে পারেন যে ঐক্যবদ্ধ
ভারত অসম্ভব। তিনি ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারত বিভক্তির
পরিকল্পনা ঘোষণা করেন,
যার ভিত্তিতে পাঞ্জাব ও বাংলাকে বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান
নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হবে।
এই সামগ্রিক কারণগুলোর ফলস্বরূপ, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫
আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে, কিন্তু এর সঙ্গে আসে এক
ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী বিভাজন ও বিপুল সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতি।
1 বাংলাদেশের মুক্তিজুদ্ধে বৃহৎ শক্তি বর্গের ভুমিকা আলোচনা করো ?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত জটিল, পরস্পরবিরোধী
এবং কৌশলগত স্বার্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। স্নায়ুযুদ্ধের সেই সময়ে বিশ্ব দুটি
প্রধান শিবিরে বিভক্ত ছিল, যার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের
স্বাধীনতা সংগ্রামে পড়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধে তিনটি প্রধান বৃহৎ শক্তির ভূমিকা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ভারত - প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যক্ষ ও
সহায়তাকারীর।
·
আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা: ২৫ মার্চ, ১৯৭১ সালের
গণহত্যার পর প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। ভারত সরকার এই
শরণার্থীদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করে।
·
সামরিক ও প্রশিক্ষণ সহায়তা: ভারত সরকার মুক্তিবাহিনীকে
(গেরিলা যোদ্ধা) প্রশিক্ষণ,
অস্ত্র ও নিরাপদ ঘাঁটি সরবরাহ করে। 'অপারেশন
জ্যাকপট'-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে ভারতীয়
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সহায়তা করে।
·
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন: প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা
গান্ধী আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে নিরলস চেষ্টা করেন। তিনি
বিভিন্ন দেশে সফর করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতা তুলে ধরেন এবং বিশ্বনেতাদের
হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।
·
সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ: ৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে
পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের কয়েকটি ঘাঁটিতে আক্রমণ করলে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে
যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় সেনাবাহিনী (মিত্রবাহিনী) অল্প সময়ের মধ্যে
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে পরাস্ত করে এবং ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় নিশ্চিত
হয়।
২. সোভিয়েত ইউনিয়ন - বাংলাদেশের পক্ষে নীরব সমর্থন
সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) ছিল ভারতের প্রধান মিত্র এবং বাংলাদেশের
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি শক্তি।
·
রাজনৈতিক সমর্থন: সোভিয়েত ইউনিয়ন শুরু থেকেই
পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপের নিন্দা করে এবং পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক সমাধানের
আহ্বান জানায়।
·
নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো: ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে যখন
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন
ভারতকে রক্ষা করতে এবং পাকিস্তানের সামরিক আগ্রাসন বন্ধে বারবার সেই প্রস্তাবে ভেটো
ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
·
সামরিক চাপ: ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে যখন মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে তাদের সপ্তম নৌবহর পাঠায়, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নও তাদের
নৌবহর পাঠাতে শুরু করে। এটি কার্যত মার্কিন হস্তক্ষেপের পথ বন্ধ করে দেয় এবং
পাকিস্তানের উপর চাপ বাড়ায়।
·
ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি (১৯৭১): আগস্ট, ১৯৭১ সালে
ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত 'শান্তি,
মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি' ভারতকে
সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছিল, যা পাকিস্তানকে
মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র - পাকিস্তানের সমর্থক ও হস্তক্ষেপের
চেষ্টা
স্নায়ুযুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল চীনের মিত্র এবং
পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সামরিক ও অর্থনৈতিক মিত্র। প্রশাসন ছিল পাকিস্তানের সামরিক
সরকারের সমর্থক।
·
সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা: যুদ্ধের সময় মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখে, যদিও
সরকারিভাবে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
·
কূটনৈতিক বিরোধিতা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ সৃষ্টি করে, যা কার্যত
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে সময় দেওয়ার কৌশল ছিল।
·
সপ্তম নৌবহর প্রেরণ: ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি
সময়ে যখন পাকিস্তানের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত, তখন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের
নির্দেশে মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের দিকে পাঠানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল
ভারতকে ভয় দেখানো এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে রক্ষা করা বা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত
করা। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টা পদক্ষেপ এবং ভারতীয় সামরিক বাহিনীর দ্রুত
অগ্রগতির কারণে এই নৌবহর কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি।
·
জনমত: সরকারি নীতি পাকিস্তানপন্থী হলেও, মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ এবং সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি-র মতো
গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদরা বাঙালি গণহত্যার নিন্দা করেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে
শক্তিশালী জনমত গড়ে তোলেন।
৪. গণপ্রজাতন্ত্রী চীন - পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান মিত্র
চীন ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পাকিস্তানের মিত্র এবং সোভিয়েত
ইউনিয়নের প্রতিপক্ষ।
·
কৌশলগত সমর্থন: চীন পাকিস্তানকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম
সরবরাহ করে।
·
জাতিসংঘের ভূমিকা: চীন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে 'ভারতের
হস্তক্ষেপ' হিসেবে নিন্দা জানায় এবং প্রস্তাবগুলোর
বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
·
বিরোধের কারণ: চীন মনে করত শেখ মুজিবুর রহমানের
নেতৃত্বাধীন আন্দোলন ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মদদপুষ্ট। তবে চীনের সামরিক
হস্তক্ষেপের ইচ্ছা থাকলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের চাপের কারণে তারা সরাসরি কোনো সামরিক
পদক্ষেপ নেয়নি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা ছিল দ্বিধাবিভক্ত।
একদিকে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের জোরালো সমর্থন স্বাধীনতার বিজয়কে ত্বরান্বিত
করে, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা সত্ত্বেও
তারা পাকিস্তানের পরাজয় ঠেকাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত, আন্তর্জাতিক
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের চেয়েও বাঙালি জনগণের ইস্পাত কঠিন ঐক্য, মুক্তিযোদ্ধাদের অদম্য সাহস এবং ভারতের সরাসরি সহায়তা স্বাধীন
বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিশ্চিত করেছিল।
1 ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন সমন্ধে যা জান লিখ ?
১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন ছিল তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের
প্রবর্তিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের এক স্বতঃস্ফূর্ত ও
ঐতিহাসিক প্রতিবাদ। এই আন্দোলন ছিল ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার
বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
পটভূমি ও কারণ
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের পর দেশে
সামরিক শাসন জারি করেন। ১৯৬২ সালের এই ছাত্র আন্দোলনের প্রধান কারণগুলো ছিল:
·
হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট (১৯৬২): আইয়ুব খান
সরকার বিচারপতি এস.এম. শরীফের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে। এই কমিশন যে
রিপোর্ট পেশ করে, তার মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যয়বহুল করে তোলা এবং সাধারণ
জনগণের, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামীণ ও দরিদ্র
ছাত্রদের, শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত করা।
·
শিক্ষাকে 'পণ্য' হিসেবে
গণ্য করা: এই রিপোর্টে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের শর্ত কঠিন করা, ডিগ্রি কোর্স তিন বছর করা, এবং ছাত্র বেতন
বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়। ছাত্রদের দৃষ্টিতে এটি ছিল শিক্ষার অধিকারকে সীমিত করে
সুবিধাভোগী শ্রেণির হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত।
·
গণতান্ত্রিক অধিকারের অভাব: সামরিক শাসনের অধীনে মৌলিক
গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাক-স্বাধীনতার অভাব ছিল। ছাত্ররা এই শিক্ষানীতির প্রতিবাদকে
সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লড়াই হিসেবেও দেখেছিল।
আন্দোলনের
ঘটনাপ্রবাহ
ছাত্র আন্দোলনটি প্রধানত দুটি ধাপে বিভক্ত ছিল:
১. প্রাথমিক প্রতিবাদ (মে-জুলাই, ১৯৬২)
·
গোপন কার্যক্রম: সামরিক শাসন ও কঠোর বিধিনিষেধের কারণে
প্রাথমিকভাবে ছাত্ররা গোপনে সংগঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা (যেমন
কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো,
আব্দুল মান্নান) গোপনে সভা করেন।
·
প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদ: জুলাই মাসের দিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত আকারে ছাত্র ধর্মঘট ও মিছিল শুরু হয়।
২. চূড়ান্ত বিস্ফোরণ: ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৬২
·
আন্দোলনের তীব্রতা: ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে
তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৭ সেপ্টেম্বর তারিখে সারা দেশে 'শিক্ষা দিবস'
পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
·
পুলিশের সাথে সংঘর্ষ: ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা শহরে ছাত্ররা
কঠোর সামরিক আইনের তোয়াক্কা না করে মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে মোস্তফা, বাবুল,
ওয়াজিউল্লাহ সহ অনেকে শহীদ হন।
·
শিক্ষকের সমর্থন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম
ওসমান গণি এবং শিক্ষকরা ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলির প্রতিবাদ করেন, যা আন্দোলনকে
আরও নৈতিক শক্তি যোগায়।
·
সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া: ১৭ সেপ্টেম্বরের নৃশংসতা
আন্দোলনকে পূর্ব পাকিস্তানের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শহরে ছড়িয়ে দেয়।
আন্দোলনের
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে এক নতুন মাত্রা যোগ
করে:
·
শিক্ষানীতির বাতিল: গণআন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান সরকার
শরীফ কমিশনের জনবিরোধী শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয় এবং ডিগ্রি কোর্স
তিন বছর করার সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। এটি ছিল ছাত্রদের প্রথম বড়
বিজয়।
·
গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ উন্মোচন: সামরিক শাসনের চরম
কঠোরতার মধ্যেও ছাত্ররা সাহসের সাথে প্রতিবাদ করায় এটি সামরিকতন্ত্রের দুর্বলতা প্রকাশ
করে। এটি পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের জন্য সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে
গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে ফিরে আসার পথ তৈরি করে।
·
বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ: ভাষা আন্দোলনের পর এই
আন্দোলন পুনরায় প্রমাণ করে যে, পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ নিজেদের অধিকার ও
ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন। এই আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আরও শাণিত করে এবং
১৯৬৬ সালের ছয় দফা ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের জন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্র প্রস্তুত
করে।
15.
১৯৬৯ সালের গনভ্যুথানের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরো ?
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ)
মানুষের গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনের চরম বহিঃপ্রকাশ, যা সামরিক
শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের এক দশকের স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছিল। এই
অভ্যুত্থান কয়েকটি প্রধান পর্যায় বা ধাপে বিকশিত হয়েছিল।
গণঅভ্যুত্থানের
বিভিন্ন পর্যায়
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান মূলত তিনটি প্রধান পর্যায়ে সংঘটিত হয়েছিল:
১. প্রাথমিক পর্যায়: আন্দোলনের সূচনা ও
ঐক্যবদ্ধতা (১৯৬৮ সালের শেষভাগ)
এই পর্যায়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি এবং
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠে।
·
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা: মামলাটি (১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে
দায়ের) ছিল আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ। শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশদ্রোহী হিসেবে
চিহ্নিত করার সরকারি চক্রান্ত উল্টো তাঁকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূর্ত প্রতীকে পরিণত
করে।
·
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন: আন্দোলনকে সুসংগঠিত করার জন্য
ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত
হয় এবং তারা ১১-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই ১১-দফা ছিল ছয়-দফা, ছাত্রদের
শিক্ষা ও অর্থনৈতিক দাবি এবং শ্রমিক-কৃষকদের দাবি-দাওয়ার সম্মিলিত রূপ।
·
গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ: একই সময়ে, রাজনৈতিক
দলগুলো গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ (DAC) গঠন করে এবং
আট-দফা দাবি পেশ করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক
শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
২. দ্বিতীয় পর্যায়: আন্দোলনের তীব্রতা ও
চূড়ান্ত রূপ (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯)
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১-দফা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে
আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়। এই সময় ধর্মঘট, মিছিল ও সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা
ঘটে।
·
মিছিল ও ধর্মঘট: ১৭ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের
প্রথম প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। ২০ জানুয়ারি ছাত্র নেতা আসাদুজজামান (আসাদ) পুলিশের
গুলিতে শহীদ হন। আসাদের মৃত্যু আন্দোলনকে আরও জোরালো ও জঙ্গি করে তোলে।
·
পুলিশের বর্বরতা ও শহীদের সংখ্যা বৃদ্ধি: ২৪ জানুয়ারি
পুলিশের গুলিতে কিশোর মতিউর শহীদ হন। এই দিনটিকে বর্তমানে 'গণঅভ্যুত্থান
দিবস' হিসেবে পালন করা হয়। এরপর থেকে পরিস্থিতি
নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে এবং সামরিক
শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে।
·
আগুন জ্বলন্ত প্রতিবাদ: জনগণ বিভিন্ন স্থানে আইয়ুব খানের
প্রতিকৃতি ও প্রতীকী কুশপুতুল দাহ করতে শুরু করে। সরকারি
অফিসগুলোতে হামলা হয়। সামরিক সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা অকার্যকর হয়ে যায়।
৩. চূড়ান্ত পর্যায়: সরকারের পতন ও শেখ মুজিবের
মুক্তি (ফেব্রুয়ারি-মার্চ, ১৯৬৯)
চূড়ান্ত পর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানের প্রচণ্ড চাপে সামরিক সরকার
আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
·
সেনাবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা: গণঅভ্যুত্থানের ফলে পরিস্থিতি
এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে, সেনাবাহিনীও একসময় সাধারণ জনগণের ওপর গুলি চালাতে
দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং সামরিক প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে যায়।
·
আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তি: গণদাবির মুখে সামরিক
শাসক আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার
করতে বাধ্য হন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল অভিযুক্তকে মুক্তি দেন। এই
মুক্তি ছিল অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় বিজয়।
·
আইয়ুব খানের পতন: ক্রমবর্ধমান চাপ, জনগণের
অনাস্থা এবং সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ঘাটতি হওয়ায় ২৫ মার্চ, ১৯৬৯ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ক্ষমতা ত্যাগ করেন এবং সেনাপ্রধান জেনারেল
ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ইয়াহিয়া খান দেশে পুনরায় সামরিক
আইন জারি করেন।
·
'বঙ্গবন্ধু' উপাধি: গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের পর
২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল
জনসভায় ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু'
উপাধিতে ভূষিত করেন।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছিল যে, সামরিক শক্তি
দিয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করা সম্ভব নয়। এই অভ্যুত্থান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছয় দফা থেকে এক দফা (স্বাধীনতা) আন্দোলনের পথে একটি
শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছিল।

0 মন্তব্যসমূহ